রবীন্দ্রনাথ, উরসুলা এবং নারী ক্ষমতায়নের একাল-সেকাল।
"রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন যে মেয়েদের হাতে ক্ষমতা গেলে তা হবে ভয়ঙ্কর কারণ দুর্বলের হাতে ক্ষমতা আফিমের মতো কাজ করবে, আমি হতবাক হই না। হোক না অমিতের কথা, এ জিনিষ বকলমে পুরুষতন্ত্রের মন্ত্র। বিস্মিত হই এই ভেবে যে এই মানুষটিই "স্ত্রীর পত্র" লিখেছিলেন। "অপরিচিতা" বা "হৈমন্তী" লিখে বাঙালি মেয়ের আত্মসম্মান বোধ জাগ্রত করেছিলেন। প্রকান্ড মানুষের প্রকান্ড স্ববিরোধ।" ----- কিছু দিন আগে লিখেছিলেন কেউ।
রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলো নিয়ে আমি একটু অন্যরকম ভাবে ভাবতে চাই। লেখক নিজে বলেছেন না ক্যারেক্টার ডেভেলপ করতে গিয়ে চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, সে তর্কে যাচ্ছিই না। এমনিতেও অনেক লেখায় রবীন্দ্রনাথের বিস্তর নারীবিরোধী বক্তব্য আছে। কিন্তু এই বিশেষ উক্তিটার অন্য প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া সম্ভব বলেই মনে হয়। অন্য একটা কাহিনী দিয়ে শুরু করি; উরসুলা লেগুইনের "A woman's liberation" গল্পটি। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাদোসে রাকাম। সে জন্মগতভাবে দাসী, শোমেকে জমিদারির মালিকের ঔরসে জন্ম হওয়ায় রূপে মালিকদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। শৈশবে সে মালকিনের শয্যার পুতুল, মালকিন মৃত কুকুরের নামে তার নাম পালটে রাখেন তোতি। একটু বড়ো হয়ে তোতি তার শয্যাসঙ্গিনীও।
"Perhaps you will say that I could not or should not have had pleasure in being used without my consent by my mistress, and if I did I should not speak of it, showing even so little good in so great an evil. But I knew nothing of consent or refusal. Those are freedom words."
তেরো-চোদ্দ বছর পুরতে মালকিন তাকে দিয়ে দিলেন নিজের বড়ো ছেলে এরডকে, জন্মদিনের উপহার হিসেবে। এরড ছেলেটি লেখাপড়া করে, দাসদাসীদের সঙ্গে যৌনতায় উৎসাহী নয়, দাসপ্রথা বিলোপ নিয়ে তার লড়াই। মেয়েটি চায় শারীরিক সুখ যা সে ছোট থেকে পেয়ে এসেছে, এবং তার বাইরে কিছুই ভাবতে তার ইচ্ছে করে না।
"Now you may say in disgust that my story is all of such things, and there is far more to life, even a slave's life, than sex. That is very true. I can say only that it may be in our sexuality that we are most easily enslaved, both men and women. It may be there, even as free men and women, that we find freedom hardest to keep. The politics of the flesh are the roots of power."
এই গল্পটা এখানে আরেকটু বলব। কিছুদিন পরে বড়ো মালিক মারা যায় এবং এরড তার চিতার সামনেই দাঁড়িয়ে হাজার দুই দাসদাসীকে ডেকে মুক্তিপত্র এবং বেশ খানিকটা করে টাকা দেয়। তাদের বলে, তোমরা এখন স্বাধীন, নিজেদের মতো করে বাঁচো, এই টাকা দিয়ে ব্যবসাট্যাবসা শুরু করো, ইত্যাদি। এই সমস্ত ভালোভালো কথা বলে এরড নিজের মা এবং কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে শহরে চলে যায়।
দাসদাসীরা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, ভেবেছিল তাদের কী করতে হবে কেউ বলে দেবে। ভয়ে, আশংকায় তারা দাসদের জন্য নির্দিষ্ট খামারে ফিরে যায়। এক দু'দিন সেখানেই ছিল তারা। দু'একজন বাদে কেউই পড়তে পারত না এবং মুক্তিপত্রের কাগজগুলো ফেলে গিয়েছিল মাঠে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল তারা, কারণ পুরনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, ওভারসীয়ারদের বা দিদিমাদের (তারাও প্রাক্তন দাস-দাসী) কথা কেউ শুনছিল না। দিন দুই পরে ভোর রাতে শোমেকে জমিদারির দাসখামারে হামলা হলো। পাশের জমিদারির মালিকের দাস আর ভাড়াটে লেঠেলরা ঝাঁপিয়ে পড়ল শোমেকের ওপর। সমস্ত বৃদ্ধ এবং প্রৌঢ় পুরুষকে তারা কেটে ফেলল, দিদিমাদেরও সেই একই দশা হলো। তুলে নিয়ে গেল সাজোয়ান পুরুষ এবং বাকি সব নারীকে, মেয়ে শিশুকে। পুরুষ শিশুদের ও হত্যা করা হলো। একই সঙ্গে লুঠ হলো শোমেকের গোরু, ঘোড়া এবং ফসল। পুড়িয়ে দেওয়া হলো মুক্তিপত্রের কাগজ, কেড়ে নেওয়া হলো সমস্ত টাকাপয়সা যা এরড তাদের দিয়েছিল।
শোমেকের জমিদারিতে এদের নির্দিষ্ট দায়দায়িত্ব ছিল। মালিকের খাস সম্পত্তি হওয়ায় মালিক পুরুষানুক্রমে কিছুটা দেখভাল করত, মেয়েরা সবাই যৌনদাসী ছিল না। নতুন মালিকের কাছে এরা সকলেই ছিল পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। পুরুষদের পাঠানো হলো কঠিনতম কাজগুলোতে। অনেকেই মারা গেল কঠোর পরিশ্রমে, অনাহারে। অধিকাংশ দাসীই গণধর্ষিত হলো প্রতিদিন, প্রতিরাতে। সেখানেও মারা গেল অনেকেই।
এ গল্পটা অবশ্য অনেক বড়ো। রাদোসে রাকামের মুক্তি পাবার, মুক্ত হবার গল্প। গল্পটা এম আই টিতে উইমেনস স্টাডিজের কোর্সে পড়ানো হয় এখনো। আপাতত এই গল্পের নিরিখে আমি বুঝতে চাই রবীন্দ্রনাথ অমিতের মুখ দিয়ে কী বলেছেন।
ক্ষমতা একটা অভ্যাস। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকলে কিছু বোধ, জ্ঞান ইত্যাদি অভ্যাসে পরিবর্তিত হয়, জানা সহজ এবং জানার ফল আত্মস্থ হয়। অনেকটা যেমন সংস্কৃত ভাষা ভালো করে জানা থাকলে ইন্দো-ইরানিয়ান ভাষাগুলি নিয়ে চর্চা করতে সুবিধা হয়। স্বাধীনতাও ঠিক তাই। যে কখনো স্বাধীন ছিল না, ক্ষমতাবান ছিল না, সবল ছিল না, সে হঠাৎ ক্ষমতা বা স্বাধীনতা পেয়ে বুঝে উঠতে পারে না কী করবে, খাবে না মাথায় দেবে। এর আরো প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভারতের স্বাধীনতা। শুনেছি, নেতাজী বলেছিলেন, ভারতীয়দের উচিত কুড়ি বছর একনায়কতন্ত্রে থেকে ইয়োরোপীয় সভ্যতার স্তরে পৌঁছে তবে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলন করা। এ কথার সত্যতায় প্রতীতি ঘটে যখন দেখি যে স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও আমরা ভারতীয়রা দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি, ব্যক্তি-অধিকার রক্ষা, ইত্যাদি সমস্ত মৌলিক অধিকার পরস্পরকে দিতে ব্যর্থ। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলি যে পরিমাণ ঘোড়া কেনাবেচা করে তাতে ডার্বি না জিতলেও, ঘোড়ার মাংস রফতানিতে ভারতের স্থান বিশ্বে প্রথম হওয়া উচিত ছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতা এখনো পর্যন্ত শুধুই পারিবারিক ঐতিহ্য, কালো টাকা রোজগার এবং সাধারণ মানুষের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সহজতম উপায় ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা এখনো সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সরকারি বাস ট্রেন জ্বালাই, সরকারি গুদোম লুঠ করি, কারণ, কে না জানে সরকার আর আমরা তো আলাদা অস্তিত্ব! ন'শো বছর আগে একদল বহিরাগত ভিন্নধর্মী লুঠেরা এদেশের শাসনভার দখল করেছিল। এই বিশাল বিপুল দেশ নিজের বহুমাত্রিক, বহুরঞ্জিত সাংস্কৃতিক মুখ ব্যাদান করে কালগ্রাসে তাদের গিলে আত্মীকরণ করে ফেলার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবার আগেই এলো সাদা চামড়াবিশিষ্ট, কলকারাখানা-সমন্বিত, নিজেদের অতিমহান ঈশ্বরতুল্য ভাবতে পছন্দ করা ইয়োরোপীয় শাসকরা। এরা কেউ আমাদের লোক ছিল না, হয়ে ওঠেনি। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে আজকের কোনো সরকার-বাহাদুর আমাদের নিজেদের লোক নয়। সরকারি সম্পত্তি আমাদের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় গড়ে তোলা সম্পত্তি নয়। আমরা তাই ব্রীজ বানাতে গোঁজামিল দিই, যাতে দু'তিন বছরে সে ব্রীজ ভেঙে পড়ে আমাদেরই দেশের মানুষ মারা যায়। আমরা এখনো খাবারে ভেজাল এবং মদে বিষ মিশিয়ে চলেছি, দ্রুত লাভের আশায়। ট্রাফিক পুলিশকে ঘুষ দিচ্ছি লাইন্সেন্স ছাড়া গাড়ি চালিয়ে বা গতিসীমা অতিক্রম করে, দুর্ঘটনা ঘটিয়ে। মনে পড়ে যায় ১৯৮৯ সালে তৈরি "ম্যায় আজাদ হুঁ" মুভিতে অমিতাভ-অভিনীত "আজাদ" চরিত্রটির সেই কথাগুলো, যে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে খাবার নেই ইস্কুল কলেজ নেই হাসপাতাল নেই মানা গেল, পানীয় জলটুকুও কি দিতে পারেনি সরকার! তারপর আরো তিরিশ বছর কেটে গেছে, অবস্থা কি বিশেষ পালটেছে?
আরো অজস্র ছোটো ছোটো উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় ভিড় করে আছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, যে একদা দুর্বল ছিল তার অন্যদের ওপর নতুন পাওয়া ক্ষমতার দম্ভে দ্বিগুণ অত্যাচার। ফরাসী বিপ্লব মনে করুন, বলশেভিক বিপ্লব ও। মনে করুন ১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহের সময় কানপুরের বিবিঘরে হুসেইনি খানুমের নির্দেশে দু'শো চল্লিশ জন ব্রিটিশ নারী এবং শিশুর নির্মম হত্যা। কে এই হুসেইনি খানুম? এ হলো স্থানীয় বিদ্রোহী নেতা নানা সাহেবের রক্ষিতা, নানা সাহেব যাকে ভার দিয়েছিল বন্দী ইয়োরোপীয় মহিলাদের দেখভাল করার। প্রসঙ্গত, সেই সময়ের অনেক লেখা থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ মহিলা এবং শিশু যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করার আদেশ নানা সাহেব দেয়নি, হুসেইনির আদেশে বিদ্রোহী সিপাহীরা প্রথমে একবার গুলি চালালেও বিবিঘরের ভিতর থেকে নারীকণ্ঠের আর্তনাদে তারা আর গুলি করতে অস্বীকার করে এবং বিবিঘর থেকে চলে যায়। হুসেইনি তখন নিজের প্রেমিক সরোয়ার/ সরদার খানকে নির্দেশ দেয় হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণ করার। সরোয়ার খান স্থানীয় কয়েকজন কসাইকে সঙ্গে নিয়ে বিবিঘরে ঢুকে ভিতরের সমস্ত জীবিত মহিলা এবং শিশুকে কুপিয়ে কেটে পাশের একটা শুকনো কুয়োয় ফেলে দিয়েছিল। এই ঘটনা এতোই নৃশংস এবং তৎকালীন ইয়োরোপীয় যুদ্ধরীতির বিপ্রতীপ ছিল যে দিন দুয়েক পরে যখন ব্রিট জেনারেল হেনরি হ্যাভলকের সেনা কানপুরে ঢোকে, বিবিঘরের অবস্থা দেখে শতযুদ্ধের পোড় খাওয়া সৈন্যরা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। তাদের সেই প্রাথমিক শোকই অনূদিত হয় ভয়ঙ্কর ক্রোধে, যার ফল ভুগতে হয়েছিল কানপুর এবং পরবর্তী বহু জায়গার নির্দোষ ভারতীয় জনসাধারণকে। কানপুর প্রতিগ্রহণের পরবর্তী সময়ে সিপাহী বিদ্রোহ দমনে ব্রিটরা যে নৃশংসতা দেখিয়েছে, সাধারণ নাগরিকদের ওপর অত্যাচার করেছে, ভারতীয় মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, তার অনেকটাই বিবিঘর ম্যাসাকারের ফলশ্রুতি, যার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী বেগম হুসেইনি খানুম।
আচ্ছা, আমরা আরো তো দেখিই চারপাশে, দেখি না, ছোটো ছোটো ক্ষমতায়নের ফলাফল? ইস্কুলে দিদিমণি দাদাভাইদের ফেভারিটিজম, শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক-শারীরিক অত্যাচার। অফিসে বসের অসভ্য আচরণ, সে নারীই হোক বা পুরুষ। হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সদের মুখঝামটা। যে সর্বত্র মার খায় সেও নিজের চেয়ে দুর্বল কাউকে পেলে খানিকটা আঁচড়ে নেয়। মেয়েরা আলাদা করে এই প্রকৃতির বাইরে নয়। ফলতঃ আমরা শুনতে পাই চলন্ত ট্রেনের লেডিজ কামরা থেকে পুরুষ যাত্রীদের ঠেলে ফেলে দেবার গল্প। যে ক'টা মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কথা পড়া যায় বা যারা এখনো বিদ্যমান, তাদের অধিকাংশের মধ্যেই পুরুষদের লিঙ্গসাম্য অনুপস্থিত, তারা দ্বিতীয় স্তরের নাগরিক। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার গণেশ উলটে ফেলে যা সচরাচর মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা, তা নিয়ে এলে বিশেষ কোনো লাভ হবে বলে আমি অন্তত মনে করি না।
তবে কি বলতে চাইছি যে দুর্বলের কখনোই ক্ষমতা লাভ করা উচিত নয়? না, তা মোটেই বক্তব্য নয় আমার। বরং বলতে চাইছি, পিতৃতন্ত্রের ভুলগুলো থেকে আগে ভালো করে শিখি আমরা মেয়েরা। ক্ষমতায়ন একটা ডাইনামিক প্রসেস। নিজেদের একটা কোড অফ কনডাক্ট তৈরি করি। ছোট ছোট স্ব-ক্ষমতায়ন দিয়ে যাত্রা শুরু হোক। একটা উদাহরণ হলো আত্মরক্ষা এবং অন্য দুর্বলতরদের সহায় হবার প্রচেষ্টা। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ধর্ষণ বাড়ছে, এ কথা অস্বীকার করার আজ জায়গা নেই। কিন্তু, মেয়েদের মধ্যে ধর্ষণ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়ছে না। কেন? ২০১২ সালে জ্যোতি সিংহের ধর্ষণের ঘটনার পর আমার পরিচিত অনেক মহিলাই প্রশাসনের কাছে উন্নততর সারভেইলান্স এবং মহিলা-সুরক্ষা ব্যবস্থা দাবি করেছিলেন। দাবি করেছিলেন, রাস্তাঘাটে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হোক (এই প্রসঙ্গে ট্রাফিক সার্জেন্ট বাপি সেনের নাম মনে পড়ল, যিনি একটি মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে নাকি পুলিশকর্মীদের হাতেই নিগৃহীত হয়ে মারা যান)। কিন্তু তারা নিজেরা আত্মরক্ষার জন্য, তাদের থেকেও যারা শারীরিকভাবে দুর্বল সেইসব নারী এবং শিশুদের রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত স্তরে কোনো উদ্যোগই নেননি। কিছুই কি করা যেতো না? সমীক্ষায় জানা যায় যে ২০১২-র পরে দিল্লি এবং নিকটবর্তী এলাকায় সাময়িকভাবে পেপার স্প্রে বা Mace-এর বিক্রি বাড়লেও সারা ভারতে তার কোনও উল্লেখযোগ্য প্রতিফলন ঘটেনি। অথচ এগুলো লিপস্টিকের মতোই ছোট, হাল্কা; সহজেই পকেটে বা পার্সে রাখা যায়। দশ ফুট দূরত্বে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে পেপার স্প্রে যথেষ্ট পরিমাণে কার্যকর। বিগত ছয় বছরে এই নিয়ে বহু পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে, অথচ ভারতীয় মেয়েরা একে আপন করে নেয়নি। সেরকমই, আমরা সরকারের কাছে দাবি করেছি রাত্রিকালীন পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে, কিন্তু স্কুল-স্তরে সেল্ফ-ডিফেন্স প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করবার দাবি করিনি। আসলে, আমরা নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারি না যে আমরা কারো সাহায্য ছাড়া আত্মরক্ষা করতে সক্ষম। সেসব করতে যে ন্যূনতম শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা অর্জন করার চেষ্টাটুকুও আমরা করতে নারাজ। যারা নিজেদের শরীরকে সক্ষম, সবল করতে পারে না, তারা অন্যান্য ক্ষেত্রে সক্ষমতা স্বোপার্জন করবে কী করে! ইতিহাস সাক্ষী, আজ পর্যন্ত কেউ কাউকে স্বাধীনতা বা নিঃশর্ত ক্ষমতা দেয়নি; যার প্রয়োজন তাকেই যথামূল্যে সেই অধিকার অর্জন করে নিতে হয়েছে।
এই সেল্ফ-এম্পাওয়ারমেন্ট অনেক ছোটো ছোটো, যাকে বলে বেবিস্টেপসের মাধ্যমে করা যেতে পারে। যেমন, ভারতবর্ষের পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমগুলোতে চালু আছে মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা। ভারতীয় উপমহাদেশের মেয়েরা সাধারণত শারীরিকভাবে পুরুষদের তুলনায় দুর্বল। উপরন্তু, বাসে ট্রেনে মেয়েদের সঙ্গে ঘটা শারীরিক নিগ্রহের ঘটনাও এখানে অঢেল। তাই, আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরো বেশ কিছু বছর চালুই রাখা উচিত। কিন্তু, আমরা মেয়েরা সবাই তো একবয়সী, এক শারীরিক ক্ষমতাসম্পন্ন এমন নয়! তাহলে মেয়েরা কেন "ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ" হিসেবে আসন আঁকড়ে থাকেন নিজেদের গন্তব্যস্থল না আসা পর্যন্ত? কেন অধিকাংশ তরুণী মেয়ে কোনো বয়স্ক, দুর্বল, বা গর্ভবতী মহিলাকে স্বেচ্ছায় আসন ছেড়ে দেন না? কেন আশা বা অপেক্ষা করেন যে ছেলেরাই এগিয়ে এসে সে কাজটা করবে? নিজেকে সবল, সক্ষম না ভাবলে এবং সেই অনুসারে কাজ না করলে, কারো পক্ষে অন্য কাউকে সবল করে তোলা সম্ভব নয়।
আরো আছে। যে অফিসগুলোতে মহিলা কর্মীর সংখ্যা বেশি, সেখানে মহিলা সহকর্মীরাই পারেন পালা করে সেই মেয়েটির হয়ে কিছুটা কাজ করে দিতে যে হয়তো মেন্সট্রুয়েশন চলার দরুন শারীরিকভাবে ক্লান্ত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট। অফিসপাড়াগুলোতে চালু করা যায় ছোট বাচ্ছাদের জন্য ক্রেস সিস্টেম, যেখানে মহিলাকর্মীরা তাদের বাচ্ছাদের খুব কাছাকাছিই থাকতে পারবেন, এবং যে মেয়েরা বাচ্ছাদের দুধ খাওয়ান, তারা ছোটো ছোট কর্মবিরতি নিয়েই তাদের সন্তানদের কাছে যেতে পারবেন। নিকটবর্তী এলাকার গৃহবধূরা সমবায় তৈরি করে অনায়াসে এরকম ক্রেস চালু করতে পারেন, তাতে তাদের ও উপার্জন-ক্ষমতা বাড়বে। যারা চাকরি বা ব্যবসায় যুক্ত নন, সেরকম মেয়েরা বাড়িতে শাশুড়ি-বৌমা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের চর্চা যা টিভি চ্যানেলগুলোতে বিনোদন হিসেবে দেখানো হয়, তাতে মজে না থেকে সর্বশিক্ষা অভিযান, গাছ লাগানো এবং তাদের যত্ন, বাড়ির কাছের পার্কগুলোর পরিচর্যা ইত্যাদিতে যুক্ত হতে পারেন, কর্পোরেশন বা মিউনিসিপালিটি থেকে যথোপযুক্ত নির্দেশনামা এবং অনুমতি নিয়েই। গ্রামাঞ্চলে তারা পারেন আরো বেশি করে আঙনওয়াড়ি কর্মীদের সহায়তা করতে, স্কুলের বাচ্ছাদের দেখাশোনায় অংশ নিতে। এগুলো করা যাবে না, এরকম কোথাওই লেখা নেই, কিন্তু খুঁজলে হাতে-গোণা উদাহরণ মাত্র পাওয়া যায়।
সব চেয়ে জরুরি অবশ্য, সম্ভবত, রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ। শুধু পার্টিকর্মী হিসেবে নয়, নেতৃত্বে, সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়ায়। এই উপমহাদেশ বিস্তর দেখল ধর্মের নামে, জাতের নামে, ভাষার নামে রাজনৈতিক বিভাজন; কিন্তু সবচেয়ে মূলগত পার্থক্য তো রয়েছে নারী-পুরুষের জিনেই। সম্পূর্ণভাবে "of the women, by the women, for the women" রাজনৈতিক দল আর কবে দেখতে পাবো আমরা, যারা শুধুই নারী ও অন্যলিঙ্গ, শিশু এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের কথা ভাববে, তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য, মৌলিক অধিকারগুলি নিশ্চিতকরণের জন্য, তাদের হয়েই লড়বে? এই সমস্ত পরিসর থেকেই উঠে আসুক স্বক্ষম, সক্ষম নারীরা। ততোদিনে ভবিষ্যৎ লিঙ্গসাম্যনির্ভর সমাজ গঠনের রূপরেখা নিরূপণ করে ফেলতে পারব হোমো স্যাপিয়েন্স গোষ্ঠীভুক্ত আমরা সবাই মিলে, এমন আশা রইলো।
Comments