মণিকোঠা

 

কোথায় গিয়েছিলি? বল কোথায় গিয়েছিলি? পাশের বিল্ডিং থেকে জল আনতে তোর আড়াই ঘন্টা কী করে লাগে? কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলি? অসভ্য ইতর জানোয়ার মেয়ে, এদিকে এর মা সবার জন্য খেটে খেটে মুখে রক্ত তোলার জোগাড়, আর এ সেই মায়ের মেয়ে হয়ে এরকম তৈরি হয়েছে? আজ তোকে আস্তই রাখবো না। শিগগির বল কোথায় গিয়েছিলি।

মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বৈদেহী। সবে সতেরো পুরেছে, লম্বা একহারা সর্বাঙ্গে অপুষ্টির ছাপ। মাথার সত্তর ভাগ চুল সাদা, তাই বয়কাট করানো হয়েছে। লকডাউনের আট মাসে তবু খাবারদাবার ঠিকমতো পেয়ে ওজনটা পঁয়ত্রিশ কিলো থেকে সাতচল্লিশ হয়েছে ওর। হাত পা মুখের কুঁচকানো চামড়া একটু টান হয়েছে, হয়তো একটু ফরসাও হয়েছে আগের চেয়ে। গায়ে মালকিনদের পাঁচ-দশ বছর পুরনো বাতিল ব্র‍্যান্ডেড জামাকাপড়। বৈদেহীর রূপান্তর নিয়ে মালকিনরা বড়োই খুশি। এরকম খাবার, এমন পোষাক, স্নানের জন্য এমন সাবান শ্যাম্পু বডি-অয়েল সমন্বিত জীবনযাত্রা বৈদেহীকে আর কেই বা দিত! ওকে নিয়ে তারা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে ইংরিজিতে কথা বলে। এলিজা ডুলিটল নামটা প্রায়ই শুনতে পায় সে, তবে উচ্চারণ করতে পারে না। সরকারি মারাঠি মিডিয়াম স্কুলে বিনা পরীক্ষায় নয় ক্লাসে ওঠা মিডডে মিল স্টুডেন্ট বৈদেহী কতোটুকুই বা ইংরিজি বলতে পারে, থ্যাংক ইউ, ওয়েলকাম আর অ্যালেক্সা প্লে অরিজিৎ সিং সংস বলা ছাড়া? 

ঘ্যাঁটের মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখো! মিথ্যুক আপদ মেয়ে, জঞ্জাল একটা! বল কোথায় গিয়েছিলি? মার খাবি তুই আজ। আজ কিন্তু গায়ে হাত তুলেই ফেলবো, যা রাগিয়ে দিচ্ছিস তুই আমায়! এখনো চুপ করে আছিস? 

ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে থাকে বৈদেহী। বড়ো বড়ো ভাসা ভাসা চোখের মণি আতঙ্কে বিস্ফারিত। মামার বাড়িতে বড়ো হবার সময় মামী- নানীর হাতে কালশিটে-পড়া মারের অভিজ্ঞতা আছে তার। না, এই মালকিনরা মারে না, মারেনি কখনো। খালি মারের ভয় দেখায়। কিন্তু সে বড়িদিদিকে যমের মতো ডরায়। ছোটজন বেশি খিটখিট করে বটে, কিন্তু তাকে ভয় পাবার দরকার হয় না। 

ও ফিসফিস করে বলে, কোথাও যাইনি, সত্যি বলছি দিদি। জলের এটিএমের সামনে পুজো হয়েছে না নবরাত্রির, সেটাই দেখছিলাম। 

মাস্ক না পরেই পুজো দেখতে চলে গেলি? এসে হাতে স্যানিটাইজার অবধি লাগাসনি! তুই চাস আমরা মরে যাই, তাই না? বল? 

না, না। আমি প্যাণ্ডেলে যাইনি তো। দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। 

একা একা আড়াই ঘন্টা দাঁড়িয়েছিলি? ওই পুজোর সামনেই তো সিকিউরিটি কিয়স্ক? তাহলে সিকিউরিটির নীতিন নিশ্চয়ই তোকে দেখেছে? জিজ্ঞাসা করব নীতিনকে কল করে? 

বৈদেহী কেঁপে ওঠে একটু। সেটা মালকিনের চোখ এড়ায় না। আসলে মিথ্যে বলছে ও, পুজো দেখতে যায়নি মোটেই।

বিহু, তোকে বারবার বলেছি, মিথ্যে বলবি না আমাকে। যেখানে যাবার বলে যাবি। তবু এই অদ্ভুত বোকা বোকা মিথ্যেগুলো তুই শোনাবিই! কী ভেবেছিস, দিদি বিছানায় পড়ে আছে, জানতে পারবে না? 

না দিদি। বিশ্বাস করো, কোথাও যাইনি। 

নাহ্, এভাবে হবে না। এভাবে চলতে পারে না। তোর মাকে ডাকছি কাল। ভরা বয়েসের মেয়ে আমার ঘাড়ে ফেলে দিয়ে গেছে, আমি কি তোর পিছন পিছন ঘুরবো নাকি সারাক্ষণ? তারপর একটা কিছু ঘটালে সবাই আমাকে দুষবে। তোমাকে সামলানো আমার কর্ম না মা।  এ দায়িত্ব আমি নেবো না। কাল তোমার মাকে বলে দিচ্ছি, এসে নিয়ে যাবে। 

বড়িদিদি, আমি যাইনি কোথাও। 

বৈদেহী কাঁদতে পারে না। কারো সামনে কাঁদতে তার ঘেন্না হয়। সে খালি মাথা নীচু করে ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ লাল হয়ে আসে তার।

আসলে ছ'তলার সঞ্জনার সঙ্গে নীচের বাজারে গিয়েছিলি, তাই না? বড়াপাও খেতে? 

না দিদি। যাইনি।

উফফ! ফের মিথ্যে কথা! তোদের দেখেছে মাইকেল ভাইয়া। 

বৈদেহী চোখ তোলে। ওর মা মাইকেলভাইয়ার বাড়িতেও কাজ করে। মাইকেল ভালোই চেনে ওকে। কিন্তু দেখতে পেলো কী করে? সঞ্জনার স্কুটিতে করে চটপট গিয়েছিল ওরা। বড়াপাও কিনে দাঁড়ায়ওনি, দোকানে বসে খাওয়া তো বন্ধ। এক কাপ করে কফি আর একটা বড়াপাও, দশ মিনিটও লাগেনি। কিন্তু দেরি তো হয়েছে। এখন বড়িদিদি ভাববে পুরো সময়টাই ও গল্প করছিল বসে বসে। বাকি সব ভুলে গিয়ে ওর মাথার মধ্যে খচখচ করতে থাকে, মাইকেল ভাইয়া কখন দেখলো? 

দিদি, মাইকেল ভাইয়া কী করে দেখলো আমাকে? 

তোরা যখন স্কুটিতে উঠছিলি তখনই দেখেছে। হেলমেট পরে ছিল নিশ্চয়ই, তাই তুই চিনতে পারিসনি।

খুব চেষ্টা করেও বৈদেহী মনে করতে পারে না, হেলমেট পরে বাইকে চেপে ওর সামনে দিয়ে কেউ গিয়েছিল কি না। হবে হয়তো! যা ভুলোমন! মা বলে যে মেয়ে খেতে ভুলে যায় তার যে কী দশা হবে চিড়োবা ঠাকুরও জানেন না। বড়ি দিদির রাগটা কি একটু কমল? 

বড়াপাওয়ের টাকা কোথায় পেলি?

মায়ের থেকে নিয়েছিলাম দশটাকা। 

লজ্জা করে না? খেতে পাস না এখানে, না? এই করোনার বাজারে বাইরে চরে বেড়িয়ে ছাইপাঁশ গিলে না এলে চলছে না? নাহ্, এভাবে হয় না। এটা চলতে পারে না। তোর মাকে বলছি, কাল বাড়ি নিয়ে চলে যাক। নিজের বাড়ি গিয়ে যা খুশি করগে, এখানে নয়। 

দিদি কি সত্যি তাড়িয়ে দেবে তবে? বৈদেহী বিষম টানাপোড়েনে পড়ে যায়। বাড়ি যেতে অবশ্য ভালোই লাগবে। আট মাস যায়নি। তার বাড়ি মানে এককামরার একটা ঘর, টিনের চাল দেওয়া। পিছনে গোয়াল, তাতে তাদের হরণী গাই থাকে, সঙ্গে এক বছরের বাছুর মোওরা। আর থাকে তার আদরের ছানা, গোপী কুকুর। মোওরা খুব পাজি, খালি ঢুঁ মারতে আসে। তখন গোপী তাকে বাঁচায়। তাদের বাড়ির পিছনেই ডোঙ্গর। কতো বড়ো বড়ো টিলা, ঘাসপাথর। ওদের খেত, সম্বৎসরের ধানের গোলা, আম পেয়ারা পনসের গাছ। বাড়ি মানে দুপুরভর টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়ানো, সঙ্গে ছায়ার মতো তার গোপী।

কিন্তু এবছর খেত ভাসিয়ে বন্যা নেমেছিল। ধানের গোড়া পচে গেছে, ফসল নষ্ট। মা বলেছে পঁচিশ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। দিদিরা অনেক ক'টা টাকা দেয় ওর মাকে, ওর জন্য। বাড়ি পাঠিয়ে দিলে মা কি আর আস্ত রাখবে! 

হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন এখনো? গাছে জল দিয়েছিস? বারান্দার আলো জ্বেলেছিস? শুধু খাবি ঘুরবি আর ঘুমোবি, মনে হচ্ছে হোস্টেলে থাকিস আর আমরা তোর ওয়ার্ডেন। পড়াশোনাটাও তো করতে পারিস তাহলে, আমাদের এতো পরিশ্রম আর টাকা জলে যায় না! 

বৈদেহী আমতা আমতা করে বলে, সত্যিই বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছ তাহলে?

অনেকক্ষণ বকাঝকা করে ক্লান্ত দিদি বইএর আড়ালে হাসি লুকোয়। গম্ভীরভাবে বলে, হ্যাঁ। আজকে জামাকাপড় গুছিয়ে রাখবি। আর এখন যাও, গাছে জল দিয়ে আমাকে উদ্ধার করো। 

বিকেলে তার ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। এই অশান্ত ছটফটে মেয়ের হাতে বাড়ি ছেড়ে বেরোতে প্রতিবারই ভয় করে। কিন্তু কীই বা করার। 

বাইরের কাজকর্ম শেষ করে দুই দিদি রাত ন'টা নাগাদ বাড়ি ফিরে দেখে বৈদেহী ওর জন্য বরাদ্দ ড্রয়ার থেকে জিনিসপত্র বার করে একটা কাপড়ের ব্যাগে ভরছে। 

দু'জন চোখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসি চাপে। বড়োজন বলে, এসব কী কচরা পুঁটলি বাঁধছিস? 

বৈদেহী একটু ইতস্তত করে বলে, আমাকে যে কাগজ স্কেচপেন রঙ বইটই দিয়েছিলে সেগুলো নিয়েছি। ভাইদের দেবো। আর যে হার দুল চুড়ি দিয়েছিলে, ক্লিপ টিপ এইসব। এই পরী আঁকা গোলাপী বাক্সটা নেবো দিদি? 

ভাগ! ওটা আমার বাক্স। আর ওগুলো পরী না, ডিজনি প্রিন্সেস। টিভিতে তো ফ্রোজেন দেখেছিলি, সেই যে বোনটা বরফ হয়ে গিয়েছিল? 

দেখেছিল বটে। হিন্দিতেই কথা বলছিল কার্টুনগুলো। ওদের নাম অ্যানা আর এলসা। আর কী সুন্দর একটা পুতুল ছিল, নাকে গাজর দেওয়া, নাম নাকি ওলাফ। এই টিনের গোলাপী বাক্সটা বৈদেহীর খুব পছন্দ। ওলাফকে দেখলেই ওর খালি টমি বলে মনে হয়, যদিও কোনো মিলই নেই। টমিও খুব হাসিখুশি, দৌড়ে দৌড়ে খেলে আর কাউকে ঘৌ অবধি করে না, আর ভিজে কালো গাজরের মতো লম্বা নাক! ভেবেছিল দিদিরা ওকে বাক্সটা দিয়েই দিয়েছে। দেয়নি শুনে বেশ খানিকটা কষ্ট হলো ওর। তাহলে সেই জিনিসটা কোথায় রাখবে ও? 

ইতিমধ্যে ছোটি দিদি হাত বাড়ায়, দে, বাক্স দে। 

বৈদেহী ইতস্তত করে। দিচ্ছি। একটু দাঁড়াও। 

কী এমন ভরেছিস ওতে যে দেখাতে পারছিস না?! 

কিছু না। সত্যি কিচ্ছু না। টুকরোটাকরা। আমি এক্ষুণি খালি করে দিচ্ছি। 

ওর অনাগ্রহ বড়োদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে। সারা বাড়িতে শখের জিনিস ছড়ানো আছে। মাটির গয়না থেকে দামী পেন, দেশবিদেশ থেকে আনা ছোটো ছোটো পুতুল, অজস্র লিপস্টিক নেইলপালিশ হ্যানাত্যানা। ওরা হয়তো নিজেরা কিছুই ব্যবহার করে না; কিন্তু অন্য কেউ চুরি করে নিয়ে নেবে ভাবলেই যেন রাগ হয়। 

বিহু, কী লুকোচ্ছিস, দেখা শিগগির। 

দিদি, সত্যি কিচ্ছু নিইনি। মায়ের কসম। কিছু না। এই দেখো, এগুলো সব তোমরাই দিয়েছো। 

ওই বাক্সে কী রেখেছিস, সেইটা দেখা। 

বৈদেহী কাঁপতে থাকে আলতো আলতো। কী হবে, কী করবে সে! ও বাক্সয় যা আছে তা সে কাউকে দেখাতে চায় না। 

কিচ্ছু নেই দিদি! বিশ্বাস করো! 

তোকে বিশ্বাস করব? উঠতে বসতে যে মেয়ে মিথ্যে বলে, তাকে বিশ্বাস করব! কী ভরেছিস ওতে এখুনি দেখা। বেশ ভারি মনে হচ্ছে। 

বৈদেহী হঠাৎ পিছন ঘুরে বাক্সটা খুলে তার পুঁটলির মধ্যে ঢেলে দেয় জিনিসগুলো। কীসব পড়ার আওয়াজ হয়। তার মধ্যে থেকে হাতামুঠো কী একটা তুলে এনে বলে, এই দেখো এইটা। 

দিদিরা ভেবে পায় না, হাসবে না কাঁদবে। পরিচ্ছন্নতা বাদে আর কোনো কিছুই জোর করে করানোর পরিপন্থী তারা। ওইটুকু বাচ্ছার হাত থেকে তার ব্যাগ কেড়ে নিয়ে জিনিসপত্র দেখতে চাওয়াটা তাদের কাছে বড়োই অভদ্র, হিংস্র বলে মনে হয়। ওরকম অসম্ভব আচরণ তারা করতে পারবে না, রুচিতে বাঁধবে৷ 

বড়োজন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, লেট হার বি। কাল ওর মা এলে দেখা যাবে কী ব্যাপার। 

রাতে শুতে যাবার সময় দেখা যায়, বৈদেহী তার পুঁটলিটা বুকের কাছে নিয়ে ঘুমিয়েছে। 

দিদিরা দু'জন অনেকক্ষণ আলোচনা করে। কী হতে পারে, বল তো! লিপস্টিক? মনে হয় না। আগে তাও কাজল লিপ কালার-টালার লাগিয়ে সাজতো, আজকাল তো তোকে ইমিটেট করে, সেসবও কিছু পরে না। তাহলে কি ঘড়ি-টড়ি? সব তো দেখলাম, যেমনকে-তেমন আছে। তাহলে কি পিতলের গণপতি মূর্তিটা? জেড পাথরের বুদ্ধ? ডোকরার মহাদেব? নাকি ওসব কিছুই না, অন্য কিছু? 

ও কিন্তু ভয় পায়নি, লজ্জা পাচ্ছিল, সেটা লক্ষ করেছিলি? 

যাকগে, কাল সকালে একটা হেস্ত-নেস্ত হয়েই যাবে। বাদ দে।

পরদিন সকালে দিদিরা বৈদেহীকে পাঠায় পাড়ার দোকানে। ক্যারাফে ভর্তি কালো কফি আর ডায়েটিশিয়ান অনুমোদিত জলখাবারের সঙ্গে বিশ্বের খোঁজখবর নেওয়া চলতে থাকে মোবাইলে। ছোটজন হঠাৎ বলে, ফারি ফ্রেন্ডস গ্রুপের মেসেজটা দেখলি? ওই কালো ছিটছিট স্ট্রে কুকুরটা, যার নাম টমি, ওর নাকি রেবিস হয়েছিল। মারা গেছে কাল রাতে। 

দু'জনেই আফশোস করে। মাস চারেক আগে এলাকার পারিয়া কুকুরদের খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল কেউ বা কারা। তখন জলের মতো টাকা খরচা করে পাঁচজনের মধ্যে মাত্র দু'টিকে বাঁচানো গিয়েছিল। টমি তাদেরই একজন। বিষক্রিয়ায় ওর লিভারে চাপ পড়েছিল, তাই অ্যান্টিরেবিস বা ডিস্টেম্পারের ভ্যাক্সিন দেওয়াই যায়নি। আর এখন এইভাবে রেবিসের যন্ত্রণা সহ্য করে চলে গেল বাচ্ছাটা। 

বিহু কিন্তু টমির সঙ্গে খুব খেলতো। 

হ্যাঁ। আচ্ছা, মেয়েটা কি বোকা আর সরল দেখ। এখন তো ও বাড়িতে নেই। আমরা অনায়াসেই ওর ওই ঝুলি খুলে দেখতে পারি, কী আছে, তাই না? 

পারি, কিন্তু দেখবো না, সেটাও ও জানে। কাজেই আমরা এক্সপ্লয়েট করছি, না নিজেরা এক্সপ্লয়েটেড হচ্ছি, আমি সিয়োর নই! 

হেসে ফেলে দু'জনেই আর সেই সময় বৈদেহী আর ওর মা ঢোকে। সংসারের দৈনিক যাপন শুরু হয়, সৌররথের চাকা ঘুরতে থাকে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে। রান্নাবাড়ি শেষ করে বেরোনোর সময় বৈদেহীর মূক অনুনয়ে ওর মা দাঁড়িয়ে যায়। বড়ো মালকিনকে শুধোয়, দিদি, বৈদেহী কিছু করেছে নাকি আবার! 

বড়িদিদি সাতকাহন শুনিয়ে দেয় অমনি। বলে, এমন বাঁদর মিথ্যুক মেয়ের হাতে টাকা দিচ্ছ কোন সাহসে! তোমার টাকা, তোমার মেয়ে। কিন্তু কিছু হলে আমি জানি না, বলে রাখলাম। 

রাগে ওর মা ফুঁসে উঠে মেয়েকে বলে, দিদিরা ছাড়িয়ে দিলে আমি ঘরে নেবো না, বলে দিলাম। দিদি-জামাইবাবুর কাছে গিয়ে থাকবি।  আর নয়তো কুলে কালি দিয়ে কোনো টাপোরি ছোঁড়ার হাত ধরে পালাবি, যা আজ অবধি আমাদের গুষ্টিতে কেউ করেনি। তুই তো চাস যে আমি গলায় দড়ি দি। 

বৈদেহী কেঁদে ফেলে। দিদির বাড়িতে যেদিন জামাইবাবু মদ খেয়ে এসে ওকে গান চালিয়ে নাচতে বলেছিল, সেদিন থেকেই ও ওদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেছে। 

মায়ের হাত ধরে টেনে ও বলে, বড়ি দিদিকে বলো না।  

বড়ো জন বলে, রাখতে পারি। তাহলে দেখা কাল কী লুকোচ্ছিলি। 

বৈদেহী চোখ মুছে ড্রয়ার খোলে৷ ওর মা আরো বিব্রত হয়, বোধহয় ভাবে যে হাঁদা মেয়েটা কিছু  চুরিটুরি করল না তো! 

ড্রয়ারের একদম পিছন থেকে হাতড়ে বার করে আনা হয় যে বস্তুটা, সেটা একটা গোলমতো কালো পাথর, একটু বড়ো। ওই যেমন ফুলের টবে সাজানো হয়, সাদা কালো বড়ো সাইজের নুড়ি, ওমনি। 

এই পাথরটা? দিদিরা, মা, সবাই অবাক হয়। ব্যাস? এটা লুকোচ্ছিলি কেন? কী অদ্ভুত, বিহু! এতে লুকোনোর কী আছে! একটা পাথরই তো খালি! 

বৈদেহী ফুঁপিয়ে ওঠে, তোমরা হাসবে, তাই। 

কেন হাসবো! কিন্তু এই পাথরগুলো তো বোগেনভিলিয়ার টবে রাখা আছে। তুই তুলেছিস কেন এটাকে?

আমি তুলিনি দিদি। আমাকে টমি দিয়েছিল। 

মানে? 

ওই ওপরের কোকো আছে না? ওই যে বড়ো লোমওয়ালা কুকুরটা? শেফাট না কী যেন বলো? 

কোকো? আভীরের জার্মান শেফার্ড? সে কী করেছে?

হ্যাঁ, ওই। কোকো মুখে করে বড়ো বড়ো পাথর, কাঠ নিয়ে নিয়ে গিয়ে বাগানে জড়ো করে না? তুমি সেদিন বলছিলে, ও একটা বাড়ি বানাবার কথা ভাবছে? 

হ্যাঁ, বলেছিলাম। বড়ো জন মুচকি হাসে। কোকোর আচরণটা সত্যিই খুব মজার। 

কোকো তো টমির সঙ্গে খেলতো। ওকে শিখিয়েছিল। টমি ওর দেখাদেখি পাথর খুঁজে আনত। এই পাথরটা টমি দিয়েছে আমাকে। 

টমি দিয়েছে মানে? টমি তো মারা গেছে কাল! তাও রেবিস হয়ে! আবার গল্প দিচ্ছিস? 

না দিদি! কাল পুজো দেখার জন্য গিয়েছিলাম না? তখন ওই সি ফাইভের পিছনেই যে ফাঁকা জায়গাটা, আর তার পিছনেই ডোঙ্গরটা আছে না, নীতিন ভাইয়া বলল ওদিকে টমিকে দেখেছে।

আর তুই চলে গেলি দেখতে! রেবিড কুকুর! তুই কি পাগল! 

টমি আমাকে ডেকে নিয়ে গেল যে! ও তিনদিন খেতে আসেনি তো। আমি খুঁজছিলাম ওকে। রোজ ডাকছিলাম। কাল ও ওই দূরে টিলার নীচটায় দাঁড়িয়েছিল। আমার মনে হলো আমাকে ডাকছে। আমি তাই গেলাম। কিন্তু দিদি, ও আমার কাছে আসেনি একেবারে। অনেকটা দূরে বসে ছিল। 

হা ঈশ্বর! এ কি পাগল নাকি! যতোই আদরের হোক, একটা রেবিড কুকুর! তার কাছে গিয়ে বসে থাকলি! যদি কামড়ে দিত! তুই জানিস রেবিস হলে কেমন যন্ত্রণা হয়! পাগল হয়ে যায় লোকে! একটা ওষুধ অবধি নেই। 

ভাবতেই সবার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে৷ 

জানি তো কেমন যন্ত্রণা হয়! দেখলাম তো! টপটপ করে জল পড়তে থাকে বৈদেহীর চোখ দিয়ে। টমির গোটা শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল, দিদি। জিভটা এতোটা বেরিয়ে এসেছিল। কীরকম একটা আওয়াজ করছিল থেকে থেকে, ওর খুব ব্যথা লাগছিল। মাঝে মাঝেই গজরাচ্ছিল কেমন। তারপর যেই আমাকে দেখছিল, আবার শুয়ে পড়ছিল চুপ করে। 

ওরা সবাই চুপ করে শুনতে থাকে। ওর মা বোধহয় বিঠঠলকে গড় করে মনে মনে। বিঠোবার দোর-ধরা মেয়ে তার, পাগল, কিন্তু কোলের মেয়ে যে!

টমি একবার দৌড়ে এলোও, কিন্তু আমার কাছ অবধি এলো না। বিশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর চলে গেল। আলো কমে আসছিল তো। নীতিন ভাইয়া আমাকে চেঁচিয়ে বলল চলে আয়। তখন, জানো বড়ি দিদি, টমি না, কেমন আকাশের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচু করে উউউউউ করে ডাকলো। তারপর ওই বাউন্ডারির দেয়ালটা দিয়ে যে পথটা ডোঙ্গরে উঠে গেছে, সেইখানটা দিয়ে উঠে চলে গেল। 

তখন আমি ওই ও যেখানে বসেছিল, ওইখান অবধি গেলাম। নীতিন ভাইয়াও এলো। গিয়ে দেখি, একটু দূরে, এই পাথরটা রয়েছে। আমি বললাম, এটা টমি আমাকে দিয়েছে। নীতিন ভাইয়া তখন ওটার ওপর স্যানিটাইজার ঢেলে দিল। বলল, সাবান দিয়ে ধুয়ে নিস। 

বড়ো মানুষেরা চুপ করেই ছিল সবাই। একটু পরে বৈদেহীর মা বলল, তাহলে আমি আজ আসি, দিদি। 

বড়োজন বলল, বিহু, কাঁদিস না। 

ছোটজন বলল, আইসক্রিম খাবি?

বৈদেহী চোখের জল মুছে একটু হেসে ফেলে বলল, হ্যাঁ, খাবো। দিদি, ওই গোলাপী বাক্সটা দেবে আমাকে, প্লিজ? ওই ওলাফের ছবি দেওয়া বাক্সটা?

Comments

Popular Posts