বল্টুর ঘুড়ির দোকান

শেষপর্যন্ত উঠেই গেল দোকানটা। বন্ধ কারখানার মেইন গেটের ঠিক বাইরে, ঝাঁকড়া বকুলগাছের পাশটাতে, টিনের চাল দেওয়া কাঠের ছোট্ট দোকানটা ছিল বল্টুর। পান বিড়ি সিগারেটের নয়, ঘুড়ির। রঙবেরঙের ঘুড়ি নিজেই বানাতো বল্টুদা, লাটাই নিয়ে আসতো সেই খড়দহ থেকে, কতো রকম মাঞ্জা শিখেছিল কোথা থেকে কে জানে। 

কতো কতো ঘুড়ি যে বানাতো বল্টুদা। পেটকাটি মোমবাতি চাপরাশ চিল। ঢাকার দেখাদেখি সাপঘুড়ি, ময়ূরপঙ্খী, প্রজাপতি, হাঁস। আর ছিল একটা লাল চীনে ঘুড়ি, বিশাল বড়ো একটা ড্রাগন ছিল সেটা, সোনালি জরি দেওয়া তার এইই লম্বা ল্যাজ। বচ্ছরকার দিনে, বিশ্বকর্মা পুজোর দুপুরে সে ঘুড়ি যখন উঠতো আকাশে, সব্বাই কেমন হাঁ করে চেয়ে থাকতো তার সেই বাতাস কেটে সাঁই সাঁই করে উড়ে যাওয়া দেখে। সে ঘুড়ির সঙ্গে কেউ লড়তে যেতো না; তার যা রাক্ষুসে মেজাজ! 

আরো ছিল তার পুষে রাখা সাতটা এমনি এমনি ঘুড়ি। তাদের একটু কোণা ভাঙা, একটু কান্নিক দেওয়া, হাওয়া-বাতাসে একটুখানি চেলে যাওয়া, পুরনো-মতো, একটু রঙ জ্বলে যাওয়া, আর খানিক মাথাপাগল। একটা বগ্গা ছিল, পুরো রঙবাজ, আর একটা খালি বাঁয়ে হেলে পড়ে, সেটা ন্যাকাচণ্ডী। একটা চাঁদিয়াল ছিল বটে, চুপিচুপি পাশ থেকে চিমটি কেটে পালাতো। আর একটা ছিল মুখপোড়া আহ্লাদী, সে খালি কাটা পড়ত আর লোকে কুড়িয়ে আনত এ গাছ ও গাছ থেকে। আর একটা ঘুড়ি অই দূর আকাশে উড়তো, একলাটে, যেন যাত্রাদলের বিবেক সেজেছে; আর একটা ছিল লড়াইয়ে সব্বার আগে, ঝপ করে পড়ত আর বাকি সব ভো-কাট্টা। তাকে দেখলে লোকে নমো করত, বলত জয় মা আদ্যাশক্তি, দয়া করো মা গো। 
অবশ্য সবচেয়ে ধার ছিল যার নাম ধানীলংকা। এই এত্তোটুকু ছোট্ট ঘুড়ি, দেখলে মনে হবে বাচ্ছাদের বুঝি, বাপ রে কী ঝাল। 

শেষ পর্যন্ত লড়াইটা ভালোমতো শুরু হবার আগেই সেবার ঝাপসা বৃষ্টি এলো। ঝড়েজলে কোথায় ভেসে চলে গেল ধানীটা, সবার আগে ছিল কিনা। বাকিগুলোও কেটে গিয়েছিল বোধহয়, কেউ খোঁজ রাখেনি আশ্রয়ের, নষ্ট হবার, ছড়ানো-ছিটানো অন্ধকারের। 

তারপর তো বান এলো। বকুলতলা বেয়ে জল উঠলো হেই দশ বাঁও মেলে না, মেলে না। আধভাঙা মুচড়ে গেল কারখানার মরচে পড়া লোহার গেট, দেওয়ালে সরছাপ পড়ল বাতিল হবার। জল সরতে সরতে সরতে সরতে প্রায় যখন ধূ ধূ বালিয়াড়ি, তখুনি খালি দেখা গেল সেই লাল ড্রাগনকে, আধখানা বালিতে মুখ গোঁজা, ঘরছাড়া, হারানো।  

কতোদিন আগেকার কথা সে সব? এখন যতো ঘরের দিকে যাই, ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতে ভয় লাগে।  

স্বপন দেখি, এতো এতো ঘুড়ি উঠছে আকাশ বেয়ে, স্বপনই হবে বা। দেখি, জল নেমে গেছে, কন্যা সংক্রান্তির রোদ উপচে পড়ছে। কলাপাতা সবুজ ক্ষুদে ঘুড়িটা উড়ছে আবার কেমন হাঁকড়ে, যেন পতাকা। তার আসেপাশে আরো কতো জুটেছে হৈ-হুল্লোড় বাচ্ছাকাচ্ছা, উৎসবের মতো কেমন যেন ফুল আর রঙিন আর নতুন গেটের গায়ে হলদে কমলা গাঁদার মালা, নীল নীল জামা। কারা যেন ডাকছে, উল্লাসে, হুইইইইইইইইইইও। 

দেখি, কারখানার দরজাটা খুলে যাচ্ছে, ভোঁ বাজছে শাঁখের মতো, আর ভিতরে চাকা ঘুরছে, শব্দ হচ্ছে ঘর, ঘর, ঘর। 

Comments

Popular Posts