আলিওনুশকা

এক দিগন্তবিস্তৃত ধূধূ মাঠ পেরিয়ে আমরা চলেছি, ভাই।

আমাদের জামাকাপড় ধূলিমলিন, হাওয়ার টানে ভারি। স্কুল থেকে ফিরে খাবার না পাওয়ার মতো অনাদর আমাদের চুলে, গায়েমাথায়। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে, তুই বলিস দিদি, আর যে পারি না। ওই যে দেখি ভেড়ার ক্ষুরে জল রাখা; ওই জলটা খাই?

আমি বলি, ওরে খাসনে, খাসনে ভাই; ওই জল খেলেই মনে পড়ে যাবে বড়োমার বানানো গরম লুচি সাদা আলুর তরকারি, আর তুই চার লিখতে পারবি না; তোকে মারবে কানাই মাস্টার, বলবে গাধা।

তার চেয়ে চল আরেকটু এগোই। এখানে বালির ওপর সূক্ষ্ণ চৌখুপি ঘর কাটা। এক ঘর দু'ঘর তিন ঘর। এই আমরা ঘর গুণে গুণে এগোচ্ছি, দেখ, এইটা শিলিগুড়ি, এটা উত্তরপাড়া, এই জায়গাটা অর্ধেক ডুবে গেছে বালিতে এ নিশ্চয়ই মালদা। এইবার এক পাক খেয়ে কোলকাতা হয়ে আড়াই চালে গিয়ে পড়লাম এটা কি দেহরাদুন?

এতোদূর হাঁটতে হাঁটতে এলি। এবার সামনে ঘোড়ার ক্ষুর। তুই বসে পড়ে বললি দিদি, এই জলটা খাই? দেখ, বেঁচেবর্তে আছি, কলেজে পড়েছি অবধি, জানিস? অফিস যাই? আর ভয় পাই না। সিডি, নতুন জামা, চকোলেটের জন্য বায়না করি না। বড়ো হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু ভারি তেষ্টা। এই জলটা খাই দিদি?

আমি বলি, না, ভাই রে, খাস না। খেলেই আমি পৌঁছে যাবো সেই হাসপাতালের ঘরে যখন সতেরোটা সূচ বিঁধানো শরশয্যা থেকে তুই পড়ে গিয়েছিলি আর ডাক্তাররা বলেছিল যান মন্দিরে মসজিদে চার্চে কেউ থাকলে তাকে ডাকুন। খাস না রে, খাস না। আমি তোকে এনে দেবো বেলজিয়াম থেকে, জার্মানি থেকে সেরা চকোলেট, অ্যামেরিকা থেকে টুপি, জামা। চল, আরো খানিক এগোই, ওইই দূরে দেখা যাচ্ছে বোরিভালির জঙ্গল, পওয়াইএর টিলার চুড়োয় হাওয়ামোরগ।

আরো কাতর, আরো ক্লান্ত হলাম আমরা। এতো বালির পাহাড়, এতো অন্ধ দৈন্য। চলতে চলতে পায়ের পাতা ছিঁড়েখুঁড়ে পাথরে ফুটে উঠল নীলপদ্ম। ভাই আমার শুক, সেই পাথরের পাশে রাখা ছিল
গোক্ষুরে টলটলে জল। তুই বললি দিদি রে, গলা শুকিয়ে কাঠ, রক্তচাপ ১৪৭-৯৫। আর পারি না রে, এই জলটা খাই?

আমি বলি, না ভাই, সোনা আমার, গোক্ষুরের জল বিষ, আত্মীয়স্বজনের ফিসফাস আর টিপ্পনীর মতো। খাস না ভাইরে, ওতে মেশানো আছে ঈর্ষার টক, অহমের ঝাল, অসূয়ার তেতো। ও খেলেই আবার ফিরে যেতে হবে সেই বাড়ি ভাঙায়, বাড়ি বদলে, ভিন্ন ভাতের অশ্লীল হাঁড়িতে। ওই জল খেলেই তোকে ডেকে লোকে বলবে কিশোরকুমারের সেই গানটা গাও তো বাবু, আর আমাকে বলবে ও মা, তিরিশ বছর পুরে গেল এখনো পড়াশোনার ঢং, বিয়ে করবে না, চাকরি করবে না, ছিনাল মেয়ে। বরং চল, এগিয়ে যাই। আরো একটু গেলেই নোনা জলের সমুদ্দুর, আর তা পেরিয়ে গেলেই একটা ছোট্ট সুন্দর টুনটুনির ডিমের মতো বাড়ি, পাশে টলটলে ঝরনা। সেই ঝরনার গায়ে রুপোর গাছে সোনার পাতা, সোনার পাতার আড়ালে টুপটুপে থোলোথোলো মুক্তোর ফল।  চল ভাই, সেই বাড়ি অবধি যাই। সেখানে গিয়ে প্রাণ ভরে জল খাবো, রুটি খাবো টমেটো জলপাই তেল আর ক্বাস দিয়ে, তুই খাবি ঝালঝাল আলুর দম, লুচি, রসগোল্লা আর মাছের চপ।

তুই শুনলি না, ভাই আমার। তোর মনে পড়ে গেল অগুন্তি ভাইফোঁটা আর রাখী যখন আমি একটা কথা অবধি বলিনি তোর সঙ্গে। তুই অভিমানে ঠোঁট ফোলালি আর দুইহাতে তুলে খেয়ে নিলি সেই গোক্ষুরের জল। সেই মুহূর্তে ওইই দূরের সবজে সমুদ্রটা ফুলেফেঁপে ছুটে এসে টেনে নিয়ে গেল আমাকে।

এখন আমি বাহান্ন ফুট গাঢ় সবুজ জলের তলায় শুয়ে আছি, বুকের ওপর সবুজ জলঘাসের চাদর, চোখে বালির স্রোত, চুলময় বালির জলবিনুনি। অনেক ওপরে, বেলাভূমিতে, তুই আমার নাম ডেকে ডেকে ঘুরছিস কোথাও, ইভান। তোকে ডাকতে চাইছি, বলতে চাইছি, এই সমস্ত বংশগত অভিশাপ আমরা দু'ভাইবোন মাথায় বুকে পেটে তলপেটে তুলে নিয়ে চলে গেলাম ভাই রে। তুই হলি বাহান্ন তাসের মধ্যে জোকার, আর আমি হরতনের বিবি, বুকে এফোঁড়ওফোঁড় নিষ্ফলতার বল্লম।

Comments

Popular Posts