এরগো ল্যামিয়া

বাসটা হালকা ঝাঁকুনি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়াতেই শুধু বোঝা যায় তারা পৌঁছে গেছে গন্তব্যে। এসব সরকারি নারীযানের জানলা নেই; দরজাও মাত্র একটাই। নারী-আবাসন থেকে মেয়েরা উঠে পড়লে তালাবন্ধ করে দেওয়া হয়। দু'জন সশস্ত্র রোবো তা পাহারা দেয় বাস গন্তব্যে না থামা অবধি। তাতেও যে সবসময় রক্ষা হয়, তা নয়। তবু সরকারি সম্পত্তি; তারা বেশ কিছুটা প্রচেষ্টা চালায় দেখভাল করার। অন্ততপক্ষে পঞ্চাশটা বছর যতোটা সম্ভব অক্ষত অবস্থায় কাজ করিয়ে না নিলে এই নিরাপত্তার জন্য যে বিপুল ব্যয়ভার, তা সরকারের পোষাবে কী করে?

বাসের দরজা খুলে যায়। মেয়েরা নেমে পড়ে এক এক করে। এদের সকলের বয়স তিরিশের ওপর, চেহারায় কাঠিন্য এসে গেছে। পনেরো থেকে আঠাশ অবধি প্রতি বছর বাধ্যতামূলক সন্তানধারণের সময় সরকার এদের খাওয়াদাওয়ার দিকে কড়া নজর রাখে। সুষম ডায়েট দেওয়া হয়, প্রয়োজনমত ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ইত্যাদি যোগানো হয়। সুন্দর সুস্থ পুরুষ সন্তানের আপাতত আকাশছোঁয়া দাম; তাই তার উৎপাদন পুরোই সরকারের আওতায়। আঠাশ হয়ে গেলে সন্তানধারণের পালা শেষ। এই মেয়েরা তখন চলে যায় নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কর্মযোজনায়। কেউ শ্রমদান করে শিশুপালন নার্সারিগুলোতে, কেউ হাসপাতালে, কেউ নিরাপদ যৌনসঙ্গী প্রকল্পে, কেউ বা যৌথ খাদ্য ইউনিটগুলোতে, যেখান থেকে সমস্ত কারখানায় খাবার পাঠানো হয়। ষোলো ঘন্টা শ্রমের বিনিময়ে খাদ্য, নিরাপত্তা। কিন্তু চেহারা শুকিয়ে যায় ওদের, রুক্ষ হয়, লালিত্য থাকে না।

এখন ওরা জনা কুড়ি দাঁড়িয়ে আছে এই সেন্ট্রাম-৩২ এর সদর হাসপাতালের নীচে, ভূগর্ভে, কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ দরজার সামনে। প্রতিদিনের মতো সহায়ক রোবোদের একজন ওদের আইডি চেক করে, যা ওদের বাম কানের নীচে গ্রাফ্ট করা আছে। প্রত্যেকের কব্জিতে আটকানো ছোট্ট রিস্ট ইউনিটে ব্লিংক করতে থাকে সেইদিনের কাজের লিস্ট। ওরা সেইমতো ছড়িয়ে পড়ে নিজের নিজের সাবইউনিটগুলোর দিকে। এদেরই একজনের আইডি থিটা সেভেন ট্রিপল ও।

আসুন, আমরা থিটা ৭০০০-র সঙ্গে যাই।

থিটা ৭০০০-র বয়স এখন আটত্রিশ। কম্পালসরি টার্মিনেশনের এখনো বারো বছর বাকি। ওর জন্ম হয়েছিল এই সেন্ট্রামের থিটা নারীআবাসন কেন্দ্রের সত্তর নম্বর ইনকিউবেটরে, যেভাবে সরকারি তত্ত্বাবধানে নারীরা জন্মাচ্ছে বিগত আশি-নব্বই বছর ধরে। প্রথম পাঁচ বছরের পরে ওকে ট্রেইন করা হয়েছিল নার্স হিসেবে, কারণ ওর ইন্টেলিজেন্স মার্কার বেশি ছিল, ইমোশন কম। যে নারীশিশুরা সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে পাশ করে যায় এবং যাদের ইমোশনাল মার্কার বেশি, তাদের সাধারণত ট্রেইনিং দেওয়া হয় যৌনসঙ্গী হিসেবে। অবশ্য এই সব ট্রেইনিংই কাজে লাগে আঠাশের পর। তার আগে পর্যন্ত ওরা সবাই শুধু গর্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এর জন্য দায়ী অবশ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসাফল্য। দেড়শো বছর আগে, ২০১২ সাল নাগাদ, কুখ্যাত DGR-161212 ভাইরাস, যার চালু নাম রেপভি (RapeV), ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীতে। এর আক্রমণে পৃথিবীময় পুরুষরা নারী এবং তৃতীয়লিঙ্গের মানুষদের ধর্ষণ করে হত্যা করতে শুরু করে। সেইসময় নারীসংখ্যা কমে গিয়েছিল পাঁচ শতাংশেরও নীচে; অন্যান্য লিঙ্গ পুরোই বিলুপ্ত হয়ে যায়, কেউ বাঁচেনি। রেপভিতে আক্রান্ত হয়নি এমন কিছু পুরুষ সেই আকালের সময় পালিয়ে গিয়ে সিন্ডিকেট গঠন করেছিল। তারা সেই অত্যল্পসংখ্যক মেয়েদের খুঁজে বার করে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিল অভেদ্য কয়েকটা দুর্গে। সিন্ডিকেটের বিজ্ঞানীরা সেই সময় প্রাণপণ চেষ্টা করছিল ইনকিউবেটরের মাধ্যমে পুরুষ এবং নারী দু'রকম শিশুরই জন্ম দেবার। কিন্তু প্রকৃতির আশ্চর্য পরিহাস! দেখা যায়, পুরুষ শিশুগুলি ইনকিউবেটরের বাইরে বেশিদিন বাঁচছে না, বাঁচলেও পাঁচ-ছয় বছর বয়সেই মারা যাচ্ছে দুর্বলতা-জনিত কারণে অথবা রেপভি আক্রান্ত হয়ে পরস্পরকে মেরে ফেলছে। অনেক বিফল প্রয়াসের পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারে যে ইনকিউবেটরে নারী তৈরি করে তাদের গর্ভে পুরুষসন্তানের জন্ম দেওয়াই একমাত্র উপায়, হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স নামক প্রজাতিটাকে টিঁকিয়ে রাখার।

তারই ফলশ্রুতি আজকের এই সরকার-নিয়ন্ত্রিত শিশু-উৎপাদন। প্রচুর টাকার বিনিময়ে নাগরিকরা সরকারি সম্পত্তি এই নারীদের গর্ভে আর্টিফিশিয়াল ইন্সেমিনেশনের মাধ্যমে পুরুষ সন্তানের জন্ম দিতে পারে। খরচ এতো বেশি, যে জনসংখ্যার ২৫% ও পারে না এই পদ্ধতিতে বংশরক্ষা করতে। এর ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাজটাও সুচারুরূপে সম্পন্ন হচ্ছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্সেমিনেশন কেন? কারণ রেপভি। প্রথম দিকে প্রাকৃতিক উপায়েই যৌনসংগমের মাধ্যমে নারীদের গর্ভবতী করার কথা ভেবেছিল সিন্ডিকেট। কিন্তু যে মেয়েগুলোকে পাঠানো হতো ক্রেতাদের কাছে, তারা কেউ সম্পূর্ণ ফিরত না। ফেরত আসতো হয়তো একটা হাত, বা পায়ের আঙুলগুলো। সিন্ডিকেটই কিছুদিনের মধ্যে মেয়েদের পাঠানো বন্ধ করতে বাধ্য হয়। তাদের সংরক্ষণের জন্যই। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ডোপামিন প্রিকারসর থেকে রেপভির একটা প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পেরেছিল সিন্ডিকেটের বিজ্ঞানীরা, কিন্তু তার এফেক্ট থাকে মাত্র চার ঘন্টা। শুধু ওইটুকু সময়ের জন্যই ওই ইঞ্জেকশন যারা নেয় তারা সজ্ঞানে কোনো নারীর সঙ্গে যৌনমিলন ঘটাতে পারে, তাকে ধর্ষণ বা হত্যা না করে। সেই সময়েই ক্ষরিত হয় দেহজ প্রক্রিয়াগুলির জন্য, বিশেষ করে মস্তিষ্ক এবং হৃদযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন ডোপামিন, যা পরের এক সপ্তাহ রেপভিকে ঠেকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তাই সরকার প্রতি নাগরিককে সামান্য কিছু অর্থ বা শ্রমের বিনিময়ে সপ্তাহে একবার চার ঘন্টার জন্য প্রতিষেধক দেয়, এবং নিরাপদ যৌনতা প্রকল্পের আওতায় তাকে দেয় একটি আঠাশ-পেরোনো জীবন্ত নারীদেহ।

তা, থিটা-৭০০০ এসব নিয়ে ভাবে না। অথবা সে কী ভাবে কেউ জানে না। জানতে চায়ও না। পাঁচ বছর বয়স অবধি সে নার্সারির নারীশ্রমিক এবং রোবোদের কাছে বেড়ে উঠেছিল। লিখতে পড়তে ব্যায়াম করতে দৌড়তে খেলতেও শিখেছিল। তারপর পাঁচ বছর বয়সে তাদের একটি ভিডিও এবং একটি কম্পালসরি টার্মিনেশনের সরাসরি সম্প্রচার দেখানো হয়। ভিডিওটায় ধরা ছিল রেপভি আক্রমণের প্রথম দিককার কিছু ঘটনা। কেমন করে হঠাৎ একদিন বাড়িতে স্কুলকলেজে রাস্তায় অফিসে কারখানায় হাসপাতালে খেলার মাঠে সর্বত্র মেয়েরা আক্রান্ত হলো। কেমন করে দলবদ্ধভাবে ছিঁড়ে ফেলা হতে লাগলো তাদের। ধর্ষিত, মৃত মেয়েদের দেহগুলো কীভাবে উন্মাদ উল্লাসে কুটিকুটি করে মাংস স্নায়ু হাড়ের পাহাড় বানিয়ে ফেলা হতে লাগলো। রাজ্যের পর রাজ্যে, দেশের পর দেশে কেমন করে ছড়িয়ে গেল রেপভি, তার রক্তাক্ত লাল ডানা মেলা শকুনের ছায়া কীভাবে গ্রাস করে ফেলল প্রায় সবাইকে। পৃথিবীতে কীভাবে নেমে এলো মহামারী, মড়ক। নারীশূন্য হয়ে যাবার পর জায়গায় জায়গায় সবল পুরুষরা কীভাবে দুর্বলদের ধর্ষণ করে হত্যা করতে শুরু করল। শুরু হলো চূড়ান্ত মাৎস্যন্যায়, জঙ্গল রাজ, আরবান ওয়ার।
তারপর কেমন করে হাতেগোণা কয়েকজন পুরুষ কোনোরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে কিছু দুর্ভেদ্য দুর্গ, টাওয়ার, বাঙ্কারে পালিয়ে গিয়ে শুরু করল প্রতিরোধ। অবশিষ্ট নারীদের লুকিয়ে ফেলা হলো, তৈরি হলো সিন্ডিকেট। ক্রমে সিন্ডিকেট শাসনক্ষমতা তুলে নিল নিজেদের হাতে, কৃত্রিম ঝড়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিল ডোপামিন গ্যাস। ভ্রাতৃহত্যা বন্ধ হলো, ফিরে এলো শ্মশানের শান্তি।
তারপর কীভাবে সিন্ডিকেট সরকার গঠন করল, রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণ করল, যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে আনল, কলকারখানা চালু করে আবার ঠেলে ঘোরাতে লাগলো মানবসভ্যতার চাকা। কেমন করে সরকার এখন মেয়েদের বাঁচিয়ে রেখেছে; নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে তৈরি করেছে রোবো-বাহিনী, থাকার জন্য গড়ে দিয়েছে নিশ্ছিদ্র আবাসন, জীবনের বাইশটা বছর খেয়ে-পরে ধর্ষিত না হয়ে বেঁচে থাকার জন্য তৈরি করেছে নিরাপদ নারী কর্মসূচী ও প্রকল্পগুলো। বিনিময়ে, সরকার যদি মেয়েদের থেকে একটু কৃতজ্ঞতা, একটু দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন আচরণ দাবী করে, তা কি খুবই বেশি চাওয়া! তাদের তো আর কিছুই করতে বলা হচ্ছে না, শুধু নিয়মনীতি মেনে পঞ্চাশবছর বাঁচলেই হলো। তবু, মহিলারা আশ্চর্যরকম অকৃতজ্ঞ। আবাসন থেকে তারা পালাতে চেষ্টা করে, চেষ্টা করে গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে, যা কিনা সরকারের সম্পত্তি! অবশ্য সকলেই জানে, পালানোর অর্থ মৃত্যু। ঘেরাটোপের বাইরে এক পা রেখেছ মানেই যে কোনো মেয়ের নিয়তি ধর্ষণ এবং মৃত্যু। তবু প্রতি ব্যাচেই কয়েকজন পালায়। তাদের নব্বই শতাংশ ঘন্টা চারেকের মধ্যেই মারা যায়। বাকিদের মধ্যে যাদের জীবিত অবস্থায় ধরতে পারা যায়, তাদের শাস্তি কম্পালসরি টার্মিনেশন।
তারপর থিটা ৭০০০-এর ব্যাচের ১০০ মেয়েকে দেখানো হয়েছিল একটি কম্পালসরি টার্মিনেশনের লাইভ ব্রডকাস্ট। দু'টি মেয়ে, একজনের বয়স ষোলো-সতেরো অন্যজনের বাইশ-তেইশ। তাদের উলঙ্গ করে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভিতরে অপেক্ষা করছিল কুড়ি-পঁচিশ জন পুরুষ। এরা বিপুল দামের লটারি টিকিট কেটে প্রত্যেকবার এই সুযোগ পেতে চায়; সরকারের জন্য বেশ লাভজনক এই ব্যবস্থা। মেয়ে দু'টোকে পালা করে নানানভাবে ধর্ষণ করে তারা, ছিঁড়ে নেয় স্তনবৃন্ত, স্তন কেটে নেয়, ছিঁড়ে ফেলে হাত পা। মৃত্যুর পরেও ধর্ষণ চলে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর দেহ দুটো উত্তাপ হারিয়ে কঠিন হতে শুরু করলে শেষ অবধি চিরে ফেলে দু'ভাগ করে। থিটা ৭০০০এর ব্যাচ চুপচাপ বসে দেখে পুরোটা, কয়েক ঘন্টা ধরে। সব মিটে গেলে পুরুষগুলি চলে যায়, আর রোবোরা গিয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহাংশ জড়ো করে সার কারখানায় পাঠিয়ে দেয়, পরিষ্কার করে ফেলে টার্মিনেশন রুম।

থিটা ৭০০০ পালাবার চেষ্টা করেনি। নার্সিং ট্রেইনিং এ ভালো রেজাল্ট করেছিল, তেরো বছর গর্ভশ্রম দানের সময় জন্ম দিয়েছিল বারোটি সুস্থ সুন্দর পুরুষ সন্তানের। পুরস্কার হিসেবে ওকে সেন্ট্রামেই রাখা হয়েছে। কে না জানে, সেন্ট্রামগুলোর বাইরে ছোটোছোটো জনপদগুলোতে এখনো নৈরাজ্য চলে, রেপভির দাপটও সেন্ট্রাম থেকে দূরেই বেশি। সরকারি নারীযানগুলো প্রায়ই আক্রান্ত হয় সেখানে, সম্পদহানির খবর আসে নিয়মিত। তাছাড়া সেন্ট্রামগুলোর বাইরে সিন্ডিকেটের অধীনে কৃষিজমি এবং খাদ্যশস্য প্রক্রিয়াকরণের ইউনিটই বেশি। মেয়েদের নিরাপদ শ্রম-প্রকল্প চালানো সেখানে প্রায় অসম্ভব। কাজেই সেন্ট্রামে থাকতে পারাটা একরকম সৌভাগ্যই। নার্সের কাজটাও সে সমস্ত নিয়মকানুন মেনেই করে। আগামী বারো বছর এইভাবেই ঠিকঠাক চলতে পারলে যখন তার পালা আসবে কম্পালসরি টার্মিনেশনের, তখন সরকার তাকে দেবে একটি বিশেষ নিউরোটক্সিন ইঞ্জেকশন, যা নেবার পর সে আর ধর্ষণ ও মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী যন্ত্রণা টের পাবে না।

থিটা ৭০০০ আপাতত চলেছে নিউরো সাবইউনিটের দিকে। ডেস্কে বসা রোবোটি তার দিকে একঝলক দেখলো। গোটা বাড়িটায় অবশ্য সর্বক্ষণই ঘুরে চলেছে সার্ভে ক্যামেরার একচোখো লাল আলো। তবু নিরাপত্তার খাতিরে রোবোরা সবসময়েই সজাগ। হাসপাতালে যে কয়েকজন পুরুষ ডাক্তার কাজ করে তাদের মনিটর করা হয়। গোপন ভেন্ট দিয়ে ছড়ানো হতে থাকে খুব সামান্য পরিমাণে প্রতিষেধক গ্যাস। তবু নার্সদের নিয়ম নেই কোনো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার। থিটা ৭০০০রা নিঃশব্দে কাজ করে সারাদিন।

এখন বিকেল তিনটে পঞ্চাশ। থিটার ৭০০০ এর ডিউটি ৪৫১৭ নম্বর ঘরে। নার্সদের জন্য নির্ধারিত এলিভেটরে উঠে পঁয়তাল্লিশ তলার চাবি টিপে অপেক্ষা করে সে। লিফট বেশ কয়েক জায়গায় থামে, অন্যান্য নার্সরা ওঠে নামে। চোখাচোখি হয় কয়েকজনের সঙ্গে। প্রত্যেকের মুখই ভাবলেশহীন, মুখোশের মতো। পঁয়তাল্লিশ তলায় নেমে সতেরো নম্বর ঘরের দিকে হাঁটা দেয় থিটা ৭০০০। এই পেশেন্টের ঘরে তার ডিউটি এই প্রথমবার। এর আগের নার্সকে কর্তব্যে অবহেলার দায়ে কারেকশনে পাঠানো হয়েছে পনেরো দিনের জন্য। কারেকশনে কী হয় কেউ জানে না। ফিরে এসে কোনো মেয়ে কখনো বলেনি।

শীততাপনিয়ন্ত্রিত শব্দহীন ঘরের দরজা খুলে ঢুকে থিটা ৭০০০ দেখলো বিছানায় শোওয়া এক পুরুষ, অজ্ঞান নয়, ওষুধের ঘোরে আচ্ছন্ন। সব পেশেন্ট রুমের মতোই তার বিছানার হেডবোর্ডে লাগানো রয়েছে মনিটর স্ক্রিন। তাতে পেশেন্টের নাম, পরিচয় সংখ্যা, বয়স, অসুস্থতার ধরণ, কোন ডাক্তার দেখছে, কী চিকিৎসা  চলছে ইত্যাদি সব দরকারি তথ্য রয়েছে। থিটা ৭০০০ নিজের রিস্ট ইউনিটটি তুলে ধরে মনিটরের স্ক্যান-আইএর সামনে। নিঃশব্দে লাল হয়ে যায় রিস্ট ইউনিটের সবুজ আলো। ওপরের সার্ভে ক্যামেরার চোখ স্থিরভাবে ফলো করতে শুরু করে থিটা ৭০০০ এর হাঁটাচলা। থিটা ৭০০০ ঘুরে পেশেন্টের বিছানার উল্টোদিকে দেয়ালের পাশে রাখা ওয়ার্ক টেবলের কাগজপত্র দেখতে শুরু করে। তার রিস্ট ইউনিটে ফুটে ওঠে একটি সংখ্যা, ১১৭। এবার সে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে অসুখের বিবরণ। এই পেশেন্ট একজন বিজ্ঞানী, সরকারের আদরের অতিথি। এর অসুখের নাম ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া। বিগত একশো-দেড়শো বছরে হু হু করে বেড়েছে এই রোগের প্রকোপ, যাতে প্রচণ্ড নার্ভজনিত যন্ত্রণা এবং খিঁচুনি হয়। এর কোনো প্রতিকারই এখনো বার করা যায়নি। ওষুধ দিয়ে সাময়িকভাবে যন্ত্রণা কমিয়ে রাখা যায় মাত্র। থিটা ৭০০০ তার রিস্ট ইউনিটে কী-ইন করে, একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। মুহূর্তে উত্তর আসে, দুটি টিকমার্ক। এরপর সে পেশেন্টের পাশে ফিরে গিয়ে তার হাত ও পা বিছানার পাশে লাগানো ক্লাস্প দিয়ে আটকে দেয়। এটা স্ট্যান্ডার্ড প্রোসিডিয়োর, কারণ টিএনে আক্রান্ত রোগীর ওপর রেপভি প্রতিষেধক কাজ করে না। থিটা ৭০০০ বুঝতে পারে, রোগীর শরীরে কম্পন জাগছে, আস্তে আস্তে ওষুধের প্রভাব কমছে। সে ফিরে যায় ওয়ার্ক টেবলের কাছে। রিস্ট ইউনিটে টাইমার সেট করে পনেরো মিনিটের। ক্যামেরা একমনে ফলো করতে থাকে তাকে।

ধীরে ধীরে রোগীর সাড় আসে। লাল চোখ মেলে তাকায় সে। চেষ্টা করে মাথা তুলতে, হাত পা নাড়াতে। গলা দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ হয় তার। নড়াচড়া করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা তার মুখে ফুটে ওঠে ক্রোধের অভিব্যক্তি হয়ে। নার্সকে ডাকে সে। ক্রমশ তার আওয়াজ চড়তে থাকে। অকথ্য ভাষায় নার্সকে, নিজেকে, পুরো দুনিয়াটাকেই গালিগালাজ করতে শুরু করে সে। কপালের রগ দাঁড়িয়ে যায়, কণ্ঠার কাছে ভেগাস নার্ভটা ফুলে ফুলে ওঠে। দড়ি পাকিয়ে ওঠে শরীরের নানান জায়গায় বিভিন্ন শিরা-উপশিরা। এবং যন্ত্রণা শুরু হয়। আক্ষেপে সারা শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে ওঠে পুরুষটার।

থিটা ৭০০০ পিছনে তাকিয়েও দেখে না। সময়টা দেখে নেয় একবার রিস্ট ইউনিটে। তারপর গুছোতে থাকে কাগজপত্র, ওষুধের ট্রে, টাওয়েল, জল ইত্যাদি।

ততক্ষণে অসীম যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে যেতে শুরু করেছে রোগীর দেহটা। মুখের বাঁ পাশ বিকৃত হয়ে গেছে, জিভ কামড়ে ফেলায় রক্তমেশানো গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। চিৎকার করার শক্তিরহিত হয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে নাভির কাছ থেকে। হাত পা বাঁধা না থাকলে যন্ত্রণার তীব্রতায় সে বোধহয় নিজেই নিজেকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলতো। কয়েক মিনিট এই অবস্থা চলার পরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে।

ঠিক পনেরো মিনিট অতিবাহিত হবার পর থিটা ৭০০০ রোগীর কাছে পৌঁছায় ইঞ্জেকশন ইত্যাদির ট্রে নিয়ে। ধীরেসুস্থে কার্বামাজেপিন ইঞ্জেকশন পুশ করে সে। রোগীর দেহটিকে সোজা করে শোওয়ায়, খুলে দেয় ক্লাস্পগুলো। ভেজা টাওয়েল দিয়ে যত্ন করে মুছিয়ে দেয় মুখ, দেহের কষ্টজনিত স্বেদ। ওষুধ কাজ করতে শুরু করায় ক্রমে শিথিল হয় পুরুষটির শরীর। তার জ্ঞান ফিরে আসে, ঘুমের ঘোরের মধ্যেই।

থিটা ৭০০০ ট্রে তুলে নিয়ে চলে যায় ওয়ার্ক টেবলে। তার রিস্ট ইউনিটে কী ইন করে একটি টিকমার্ক। উত্তরে আরেকটি টিক ফুটে ওঠে। এবার সে ডিউটি শেষ হয়েছে জানাতে ফিরে যায় পেশেন্ট মনিটরের সামনে। তুলে ধরে নিজের রিস্ট ইউনিট। মুহূর্তে লাল থেকে সবুজ হয়ে যায় ইউনিটের আলো, সার্ভে ক্যামেরাও ব্লিংক করে একবার।

ঘর থেকে বেরোবার আগে থিটা ৭০০০ রোগীর দিকে তাকায় একবার, পূর্ণ দৃষ্টিতে, ভাবলেশহীন মুখে। এই পুরুষটি এখনো পর্যন্ত ১১৭ জন নারীর মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিন্তু এর চিকিৎসা চলবে আরো কিছু দিন। এখনো তার রিস্ট ইউনিটে তিনটে টিক ফুটে ওঠেনি। সে খুব আস্তে করে বলে, এরগো ল্যামিয়া। তারপর দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়।

বন্ধ ঘরে সেই মৃদু শব্দ হাল্কা তরঙ্গ তুলে ডুবে যায়। কিন্তু তলিয়ে যায় কি? শক্তি অনঘ, অনন্তবিস্তার, অজর। সে ফুরিয়ে যায় না, তাকে মারা যায় না; রূপান্তর ঘটে মাত্র। সেই মুহূর্তে, ওই ক্ষুদ্র তরঙ্গ তার ছোটো ছোটো অসংখ্য অনুরণনের ওপর ভর করে ছুটে যায় সতেরো নম্বর ঘর ছাড়িয়ে বহুদূর। হাসপাতালের বাইরে, সরকারি এলাকার বিদ্যুৎবাহী পাঁচিলের বাইরে, সেন্ট্রাম ৩২-র গণ্ডী ছাড়িয়ে বহু বহুদূর, যেখানে সে ভিড়ে মিশে যায় আরো আরো অনেক শব্দের, তথ্যের। সবাই মিলে তারা ছুটে যায় আবহমণ্ডলের বাইরে, মহাকাশে বিচরণশীল স্যাটেলাইটগুলোর দিকে। সেখানে এক মাদার ওয়েভ তাদের পিঠে তুলে আবার ফিরে যায় সারা পৃথিবীময়  ভূগর্ভের নীচে লুকনো দু'আড়াইশো বছর পুরনো আণবিক বোমা-প্রতিরোধক বাঙ্কারগুলোতে। এগুলোর খবর আজো রাখে না সিন্ডিকেট-সরকার। এইরকমই একটা বাঙ্কারের ভিতর পৌঁছায় রূপান্তরিত ফোটন তরঙ্গটি। বাঙ্কারের ভিতর সেই ঘরে তখন শুধুই দেওয়াল জোড়া কিছু স্ক্রীন, আর তার সামনে নিজেদের ডেটা ইউনিটের সামনে বসা অগুণতি কালো কালো সিলুয়েট। নিঃশব্দ নয়। কীপ্যাডে আঙুল চলছে ঝড়ের মতো, হাসি ঠাট্টা বিদ্রূপ কান্না ক্রোধ নানারকম অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে চোখে মুখে, কণ্ঠস্বরে। থিটা ৭০০০-এর রিপোর্ট আসতে কালো ছায়াদের কেউ পাশের জনকে বলে, ১১৭ জনকে মেরেছে। অন্যজন বলে, ওসব রাখ, এ সিন্ডিকেটের বিজ্ঞানীদের একজন, যারা জানে রেপভি বলে কিছু হয় না। যারা জানে প্রতিষেধক একটা ধোঁকার টাটি। যারা দেড়শো বছর আগে একটা মব ফ্রেঞ্জিকে নিয়ন্ত্রণ না করে বাড়তে দিয়েছিল, শুধু নিজেরা ক্ষমতায় আসবে বলে। এর টার্মিনেশন আরো দেরী করে হোক।
প্রথম জন বলে, হ্যাঁ। তাই হোক। এরগো ল্যামিয়া।
-- সোনো লিলিথ।

সেই সময় ঘরটাতে আরো অনেক খিন্ন, তুচ্ছ, অতিক্ষুদ্র কিন্তু সপ্রাণ তরঙ্গ ভেসে আসছিল। সারা পৃথিবী থেকে, ছুটে আসছিল সেই সব ধ্বনি, যাদের হত্যা করা যায় না, কিছুতেই শেষ করে দেওয়া যায় না। সমস্ত বাঙ্কার গুঞ্জরিত হচ্ছিল অগণিত ফোটনতরঙ্গের অভিঘাতে, যারা বারবার শপথ নিচ্ছিল, বলছিল মাদার, দমিত্রী, হেকেটি, ল্যামিয়া, লিলিথ, লিলিতু, আস্তার্তে, ইশতার, দেবী, চণ্ডিকা, চামুণ্ডা, দুর্গা। বলছিল, অহং সুবে পিতরমস্য মূর্দ্ধন্‌ মম যোনিরপ্‌স্বন্তঃ সমুদ্রে। বলছিল, আভে মারিয়া। এদের দেখুন, চিনে নিন। এরা সেইসব ডাকিনীদের গর্ভজাত সন্তান, যাদের কেউ পোড়াতে পারেনি, পারে না।

Comments

mohor said…
puro vableshheen hoe pore gelum... jodio apnr lekha amr moton samanya meyer purota bodhogomya na holeo jototuku anudhabon krlm, ta ihokaler jonno jotheshtha...... etuku blte pari... valo lglo.. porbo ichha rakhi... apnr lekha tanche amay.... toronge vaschi... sutor tane abr asbo fire......

Popular Posts