বিদ্যাবতীকথা

প্রথমাংশ

শুন শুন সর্বজন শুন দিয়া মন
অপূর্ব পূবালী কথা করিব বর্ণন
এক দেশেতে ছিল এক রাজার নন্দিনী
গুণের বাখানী তার রূপে তরঙ্গিনী
তাহারে দেখিলে হয় প্রাণের আরাম
বড়ো সাধে রাখে রাজা বিদ্যাবতী নাম
বাপের চক্ষের মণি মায়ের দুলালী
দিনে দিনে ভরি উঠে কুসুমের ডালি

সে অনেক, অনেক দিন আগেকার কথা। এক দেশে এক রাজকন্যা ছিল। সে ভারী শান্ত, পড়ুয়া মেয়ে, ভারী গুণী মেয়ে। সাধ করে রাজা-রানী তার নাম রাখলেন বিদ্যাবতী।

বিদ্যাবতী ষোলোটি বছরের হলো তো তার বরপাত্র সন্ধান করতে রাজা দেশে দেশে ভাট পাঠালেন। বিদ্যাবতীর পট নিয়ে তারা কতো রাজা যুবরাজ রাজপুত্রকে দেখালে, তার অশেষ গুণপনার সুমধুর বর্ণনা করলে। সেসব শুনে এক এক করে তারা সবাই পিছু হটতে লাগলো। এতো রূপ! এতো গুণ! কোথায় বা রাখি, কী বা করি!
বিফল মনোরথ হয়ে একে একে সব দূত ফিরে এলো বিদ্যাবতীর পুর। রাজা-রানী সব শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন।

রানীরে ডাকিয়া রাজা কহিল শ্রীমতী
এ হেন সঙ্কটে কহো কী বা হবে গতি
অতি বড়ো সুন্দরী যে নাহি পায় বর
পুরাণে এমন কথা কহিছে বিস্তর
ডাগরসুন্দরী কন্যা ঘরে রাখা দায়
সোনারূপা তুচ্ছ করি চোরে নিয়া যায়
কাহারে সঁপিয়া যাবো বুকের নিধিরে
কী দারুণ দুঃখ দিল আহা রে বিধি রে
কল্য প্রাতে যারে দেখি কন্যা দিব তায়
ইহা ছাড়া কিছুমাত্র না দেখি উপায়
কন্যা দিয়া জামাতারে অর্ধরাজ্য দিব
একে না হারায়ে মোরা উভয়ে লভিব
রানী কহিলেন তবে যা করেছ মন
তাই হোক যাহা আছে ললাটলিখন

সখীরা এ কথা গিয়া কন্যারে বলিল
কপালে কঙ্কণ হানি ভূতলে পড়িল
রাজার নন্দিনী সখী ননীর পুতলী
হেন অলক্ষুণে কথা কোন মুখে বলি
কান্দিয়া না পাই কূল কী করিব আর
চোর ভিক্ষু রুগ্ন স্বামী ভাগ্যে যে তোমার
হায় হায় তোমা-হেন অমূল্য নিধিরে
কী দারুণ দুঃখ দিল আহা রে বিধি রে

শুনিয়া উঠিল কন্যা বলিল পিতার
আমার ভাগ্যের 'পরে নাহি অধিকার
স্নেহময় পিতা মোর কারণে অসুখী
হইয়া এমত কথা কয়েছেন সখী
এ কথা মানি না আমি বিহা না করিব
যতেক আশ্চর্য শুনি ঘুরিয়া দেখিব
পড়িব শুনিব যাবো দেশে-দেশান্তরে
খুঁজিব জগতে মোর মনের বন্ধুরে
যা করেন বিধি সবই কল্যাণ লাগিয়া
শান্ত হয়ে নিজকাজে দাও মন গিয়া
ভেবো না, কহিব আমি মা'র সঙ্গে কথা
মা নিশ্চিত বুঝিবেন দুহিতার ব্যথা
এতেক বলিয়া সবে করিল সান্ত্বনা
নির্জনে বসিয়া পরে হয়ে অন্যমনা
আকাশ-পাতাল কতো ভাবিতে লাগিল
শৈশবে জনক-স্নেহ মনে উছলিল
ভাবিল কেন যে হায় আসিল যৌবন
কতো সুখে মাতৃক্রোড়ে ছিল এ জীবন
না জানি অদৃষ্টে মোর কী যে আছে হায়
অশেষ অপত্যস্নেহ তাও কি ফুরায়
এ আঙন এ উদ্যান এ ঘর-দুয়ার
জনক-জননী ছাড়া কি বা জানি আর
কেমনে ছাড়িয়া যাবো চক্ষের নিধিরে
কী দারুণ দুঃখ দিল আহা রে বিধি রে

বিদ্যাবতী ভাবে আর ভাবে। ভেবে ভেবে বেলা পাটে গেল। মা'কে বলব, রানীমা'কে? তিনি কি বাবাকে বোঝাতে পারবেন? মনে তো হয় না। বিবাহ করতেই হবে এ নিয়ম কার তৈরি? এ নিয়ম কি পুরুষেরও? তবে অস্ত্রগুরু বিবাহ করেননি কেন? কাব্যগুরু চিরকুমার কেন? মন্দিরের সাধিকা যোগিনী একাকিনী কেন? নাহ্, পিতামাতা শুনবেন না। চিনি না জানি না যাকে-তাকে ধরে এনে বিয়ে দিয়ে দেবেন। সে ব্যক্তি হয়ত মূর্খ নিরক্ষর পাগল, সারাজীবন তার সঙ্গে কী করে থাকবো? স্বর্ণপিঞ্জরে পালিত শুকপাখির মতো, পায়ে পায়ে শৃঙ্খল বাজবে! তাহলে কী করব, কী করি? বরং পালাই। কিরণমালা রাজকুমারীর গল্প শুনেছি, দুই ভাই অরুণ-বরুণকে বাঁচাতে পুরুষের ছদ্মবেশে কেমন ক্ষীরসাগরের পাড়ে মায়াকানন থেকে রুপোর গাছে মুক্তোর ফল সোনার পাখি জীয়নঝর্ণার জল সে এনেছিল। কিরণমালা পারে, আমি পারি না?

এতেক ভাবিয়া কন্যা রাতের গভীরে
ধরিল পুরুষবেশ নওল শরীরে
আন্ধারে পশিয়া গেল মন্দুরার পানে
রোহিত প্রিয়াশ্ব তার বাঁধা সেইখানে
কাঁদিল জড়ায়ে ধরে রোহিতের গলা
এ দুস্তর পথে যাবো একাকী অবলা
যাও বন্ধু শীঘ্র যাও যতোদূরে পারো
নগর বন্দর ছাড়ি গ্রামমধ্যে আরো
আমার বাহন ব'লে সবে চেনে যদি
ধরা নাহি দিও কাল গোধূলি অবধি
তুমি একদিকে যাও আমি আর দিকে
ভুলো না মনেতে রেখো আবাল্যসখীকে
কাঁদিল সে মূক জীব মৃদু হ্রেষারবে
স্নেহ নাহি জানে ভেদ পশু বা মানবে
চলিল রোহিত তবে উত্তর দিশায়
বিদ্যাবতী পদব্রজে বিপরীতে যায়

দক্ষিণে রয়েছে এক অরণ্য গহন
প্রবেশিল তায় গিয়া থাকিতে গোপন
ধীর পদক্ষেপে চলে অতি সাবধানে
প্রতি পদে প্রাণভয় বিদ্যা তাহা জানে
এ অরণ্য চেনা তার মৃগয়া কারণে
দিক বোঝা দায় হলো অন্ধকার বনে
যেতে যেতে কতোক্ষণ বন মধ্য দিয়া
পায়ে-চলা শীর্ণ পথ পাইল খুঁজিয়া
কাঠুরিয়া দল বুঝি সেই পথে যায়
দিশা পেয়ে কন্যা তবে চলিল ত্বরায়
সারা রাত্রি চলে কন্যা একা সাহসিনী
যেন দিনকর-লাগি ভ্রমে নিশিথিনী
প্রভাতে পৌঁছিল এক সরোবর কূলে
ক্লান্ত তনু এলাইল অশ্বত্থের মূলে
বলিল হে বৃক্ষ যদি সত্য বৃক্ষ হও
তোমার শরণে আসি আমারে বাঁচাও
নিদ্রায় ধরেছে মোর চক্ষু নাহি চায়
ঘুমাবো কিয়ৎকাল রহো পাহারায়
প্রাচীন সে বৃক্ষ বুঝি সত্য বৃক্ষ ছিল
শাখাপত্র দিয়া এবে তারে আবরিল
নিশ্চিন্তে নিদ্রিত হলো রাজার তনয়া
দ্বিপ্রহরে  জলপান করিল উঠিয়া
দীঘির নিকটে কতো আছিল রসাল
জম্বুড়া পনস নিম মহুয়া তমাল
খুঁজিয়া পাইল পাকা বৈঁচির ফল
খাইল উদর ভরি ইহাই সম্বল
ইতিউতি চাহি কন্যা দীঘিতে পশিল
স্নান করে বেশবাস রৌদ্রে শুকাইল
নাইতে খাইতে বেলা গেল পাটে তবে
ভাবিল গোধূলিকাল সমাগত ভবে
রোহিতাশ্ব পড়িয়াছে ধরা এতোক্ষণে
ছেড়ে চলে যেতে হবে এ দীঘি কাননে
উঠিল নিঃশ্বাস ছাড়ি চলিল আবার
এই রাত্রে যেতে হবে অরণ্যের পার

ইতিমধ্যে রাজবাড়িতে তো হাহাকার পড়ে গেছে। ভোরে উঠে সখীরা দাসীরা দেখে শয্যায় কন্যা নাই। ক্রীড়াকুঞ্জ পদ্মসায়রে নাই, উদ্যানবাটিকায় পাঠগৃহে নাই। অস্ত্রাগারে প্রশিক্ষণশালায় নাই, হায়, কোথাও নাই। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে ভয়ে থরথর কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে তারা রাজা-রানীকে খবর দিল। রানী শুনে কপাল চাপড়ে ভুঁইয়ে আছড়ে পড়লেন। রাজা মন্ত্রীসান্ত্রী ডেকে ছুটলেন মন্দুরার দিকে, গিয়ে দেখেন রোহিতাশ্ব নাই।
তখন কোটালকে ডেকে বললেন, যে ঘোড়া ধরতে পারবে তাকে হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেবো, দিকে দিকে লোক পাঠাও, গ্রামে-গঞ্জে ঢোলডগর দাও। কোটাল হাজার ঘোড়াডোম দশদিকে পাঠিয়ে দিলে।

দ্বিতীয় অংশ

অশ্বারোহী রাজদূত গণিলে হাজার
সারা রাজ্যে রটি দিল বারতা রাজার।
রাজকন্যা বিদ্যাবতী গিয়াছেন চুরি
তার ঘোড়া রোহিতাশ্ব নাহি মিলে জুড়ি।
কন্যারে খুঁজিয়া দিলে অর্ধরাজ্য পাবে
রাজার জামাতা হয়ে সুখে দিন যাবে।
ঘোড়া যদি ধরে দাও পাবে পুরস্কার
সহস্রটি স্বর্ণমুদ্রা প্রতিজ্ঞা রাজার।
দিকে দিকে গেল দূত ঢেটরা পিটিয়া
শহর বন্দর হাট গ্রামগঞ্জ দিয়া।
শুনিল যে দেশবাসী অবাক মানিল
এ কোন আজব চোরে রাজকন্যা নিল!
সবে মিলে হুড়োহুড়ি করে খোঁজে ঘোড়া
লালরঙা ছিল যতো আনে জোড়া জোড়া।
শেষে পেলো রোহিতাশ্ব বহুদূর গাঁয়
শতজনে মিলে তারে ধরিতে না পায়।
ক্ষুরেতে স্ফুলিঙ্গ ওড়ে শ্বাসে বহে ঝড়
দুর্দান্ত সে অশ্ব ধায় পলকে প্রান্তর।
শেষে রোহিতাশ্ব দেখে দিনান্তের আগে
ক্রন্দসী রোহিত হলো অস্তাচলরাগে।
তখন আপনি সে যে শান্ত হয়ে রয়
রাজার পিয়াদা এসে বাঁধিল নিশ্চয়।
কাছাকাছি আছে কন্যা প্রজারা ভাবিল
উত্তর দিশায় তারে খুঁজিতে লাগিল।

অন্যদিকে আর দূত পৌঁছিল রাজার
দক্ষিণে অরণ্য-ঘেঁষা গঞ্জের বাজার।
সেথায় পড়িল কাঠি ঢোল ডগরেতে
রাজাজ্ঞা হাঁকিল জোর পথে যেতে যেতে।
বাজারে আছিল এক গুণিন ব্রাহ্মণ
ডাকসিদ্ধ বলে তারে জানে সর্বজন।
রাজার বারতা শুনি মনেতে ভাবিল
কতক ধূলার পরে আঁকিবুঁকি দিল।
গণিয়া বুঝিল স্থির বিদ্যা কোথা যায়
আপন গাঠরি নিয়া চলিল ত্বরায়।
দ্রুত পদক্ষেপে আসে গঞ্জের সীমায়
সেথায় দাঁড়ায়ে কোন অদ্ভুত বিদ্যায়,
মুহূর্তে পৌঁছায়ে গেল সরোবর কূলে
জঙ্গলের মাঝে সেই অশ্বত্থের মূলে।
খুঁজিয়া দেখিল দ্রুত কন্যা নাই সেথা
অশ্বত্থেরে ডাকি তবে কহিল এ কথা,
কহো বৃক্ষ তুমি যদি সত্য বৃক্ষ হও
কোথা গেল বিদ্যাবতী আমারে শুনাও।
সত্যবৃক্ষ ত্রিকালজ্ঞ মূক হয়ে রয়
ক্ষোভে তারে সে গুণিন কটুবাক্য কয়।
পুনশ্চ ধূলার পরে আঁক কাটে কতো
বিদ্যা গেছে কোন পথে হইল নিশ্চিত।
তখন সে দ্রুত গেল অন্য পথ ধরে
সঙ্গোপনে পঁহুছিল আপনার ঘরে।
বনমধ্যে তার এক কুটীর আছিল
সেথায় দাঁড়ায়ে কতো মন্ত্র সে পড়িল।
দিল সব পথঘাট বন্ধন করিয়া
এড়াতে নারিবে কন্যা কুটীর লখিয়া।
অতঃপর সে গুণিন বসে শান্ত মনে
ধূপদীপ জ্বালাইয়া পূজার আসনে।
মনে মনে ডাক দেয় কারে নিরন্তর
এমনে কাটিল রাত্রি তৃতীয় প্রহর।

এদিকে রাজকন্যা তো জানে না গুণিনের কথা। সে চলেছে সেই পায়ে-চলা পথ ধরে, ধীরে ধীরে। কোথাও জনমনিষ্যি নাই। সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছে, অন্ধকার নামছে জঙ্গলের বুকে। বিদ্যাবতী ভাবছে, আজকের রাতটা কোনোমতে পার করে দিতে পারলেই ভোর নাগাদ পৌঁছে যাবো রাজ্যের সীমানায়। কোনো গ্রামে গিয়ে মন্দিরে আশ্রয় নেবো। আহা, বড়ো ক্লান্তি। কিন্তু থাকা যাবে না; বাবা নিশ্চয়ই পাইক পাঠিয়েছেন সব জায়গায়। একটা ঘোড়া কিনতে হবে। ঘোড়ার কথায় রোহিতাশ্বকে মনে পড়ল, চোখে জল এলো। আহা, রোহিত, চিরবন্ধু আমার!
জলে বুক ভেসে যায়, চোখ বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যাবতী হোঁচট খেয়ে পড়ল পথের ওপর, হাঁটুর কাছটা ছড়ে গেল, বাম পায়ে কাঁটা বিঁধল।

চলিতে চলিতে বনে একাকী আন্ধারে
কণ্টকে কাটিল পদে রক্ত বহে ধারে।
উহ্ মা বলিয়া বিদ্যা বসিয়া পড়িল
কী করিব বিধি তোর মনে যে কী ছিল!
হেনকালে দেখে দূরে প্রদীপের আলো
ওইখানে কারো ঘর এমত ভাবিল।
অতি কষ্টে চলে কন্যা আলো লক্ষ্য করে
অন্ধকারে কী বা পথ বুঝিতে না পারে।
কুটীরের দ্বারে এসে ক্রমে পঁহুছিল
কে বা আছো রক্ষা করো বলিয়া ডাকিল।

কুটীর হইতে তবে বাহিরায় কোন
বয়স্ক ব্রাহ্মণ এক সৌম্য দরশন।
তাহারে কহিল বিদ্যা শুন মহাশয়
পায়েতে বিঁধেছে কাঁটা বহু রক্তক্ষয়।
কিছুকাল যদি হেথা থাকিবারে পাই
ঋণী রবো আজীবন আমি হে গোঁসাই।
ব্রাহ্মণ কহিল তারে এস ঘরে মোর
ভিষগ ব্রাহ্মণ আমি দেখিলে সত্বর,
ক্ষতস্থান বেঁধে দিব শীঘ্র সেরে যাবে
হাঁটিতে চলিতে কোনো যাতনা না পাবে।
বিদ্যাবতী ভয়হীনা প্রবেশিল ঘরে
ব্রাহ্মণ যতন করি বসাইল তারে।
বাতাসা ধরিয়া দিয়া জল আনি দিল
অতঃপর পাশে বসে ক্রমে শুধাইল।
কে তুমি হে কোথা যাও নওল কিশোর
গ্রাম নাহি কোনো হেথা অরণ্য যে ঘোর।
বিদ্যা কহে বণিকের পুত্র হই আমি
পিতার বাণিজ্য তরে স্বর্ণদ্বীপগামী।
অরণ্যের পরে আছে নদীর বন্দর
তাহারই লাগিয়া আমি আসি এ-দিগর।
ব্রাহ্মণ কহিল দেখি কাঁটা বিঁধে কোথা
না দেখিলে বুঝি কীসে কতখানি ব্যথা।
পদতল দেখাইতে করে ইতস্তত
কন্যারে চিনিল এবে হইয়া নিশ্চিত।
ব্রাহ্মণ কহিল তারে মনে মনে হাসি,
কণ্টকে কেটেছে তনু বিষ দিব নাশি।
পদতল রাখো মোর জানুর উপর
চিকিৎসা করিতে হবে অতীব সত্বর।
সলাজে রাখিলা কন্যা বামপদ তার
ব্রাহ্মণ গম্ভীর তার আকার-প্রকার।
অতি সূক্ষ্ম সূচ দিয়া নিকাশিল কাঁটা
মুছিয়া ক্ষতের মুখ ওষধির বাটা
যতনে প্রলেপ দিল বাঁধিল কাপড়ে,
বিদ্যা নতমুখে তারে ধন্য ধন্য করে।
মিছে সাধুবাদ নিয়া কী করিব আমি
পুরস্কার দাও কিছু কহে গৃহস্বামী।
বিদ্যা কহে এই লহো সোনার কুণ্ডল
ব্রাহ্মণ কহিছে, বেণে, এটুকু সম্বল!
এইটুকু মূল্য বুঝি এতো চিকিৎসার!
পুরস্কার দিতে চাও করো অঙ্গীকার।
রাজার নন্দিনী তবে কহে মহাশয়,
কী চাহো বলহ মোরে যাহা মনে লয়।
হাসিয়া ব্রাহ্মণ তারে কহিল, হে ধনি,
এতো বুড়া হই নাই চিনি না রমণী!
মনে রেখো করিয়াছ কী বা অঙ্গীকার
বিবাহ করিতে হবে আমাকে তোমার।

ব্রাহ্মণের বাক্য শুনি কন্যা চমকিল
সত্রাসে আপন পদ টানিয়া লহিল।
কহে কন্যা শুনিলাম ছি ছি এ কী কথা
পিতৃতুল্য তুমি আমি শরণে আগতা।
করিয়াছ জানি তুমি মহা উপকার
খুলিয়া দিতেছি মোর সব অলংকার।
রাজার নন্দিনী, শুন, কহিল ব্রাহ্মণ  
তোমার পিতার আজ্ঞা করহ পালন।
কন্যা হয়ে পিতৃবাক্য কে না মানে কবে
এই ঘোর কলিকালে এও কি সম্ভবে!
কল্য প্রাতে তোমা লয়ে রাজপুরে যাব
কড়ায় গণ্ডায় মোর প্রাপ্য বুঝে নিব।
বিদ্যা কহে হে ব্রাহ্মণ এ কী কহো আর
কোনো মূল্য নাই মোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার!
শুনিয়া কহিল সেই চতুর গোঁসাই
বয়স্ক পুরুষ বুঝি মনে ধরে নাই!
ভাবিও না কন্যা তুমি শুন অনর্থক
নিমেষে হইতে পারি সুন্দর যুবক।

মুহূর্তে হইল বিদ্যা মহা ক্রোধান্বিত
কহিল এ বাক্যে দিই ধিক্কার সতত।
আমি নহি কোনোমতে অধীন পিতার
স্বেচ্ছামতো বাঁচিব এ জীবন আমার।
থাকিব না আমি কারো গৃহের পিঞ্জরে
চাহি আমি নানা দেশ ঘুরে দেখিবারে
হইতে চাহি না আমি ঘরণী গৃহিণী
যদিও রয়েছি এবে তোমা কাছে ঋণী
নিতে পারো তুমি মোর সমস্ত গহনা
কোনোরূপে তুমি মোরে করেছ ছলনা
পথ ভুলে কী প্রকারে এসেছি এখানে
কিছু তো করেছ গুণ মন নাহি মানে
দৃষ্টি তব ভালো নয় বুঝি এতোক্ষণ
যৌবন না রাখে ঢেকে অসুন্দর মন
অর্ধরাজ্য লও গিয়া শুন মহাশয়
অনিচ্ছুক হলে নারী বিবাহ না হয়

কহিল গুণিন তবে নিজ মূর্তি ধরে
বামপদ রাখিয়াছ জানুর উপরে
হইয়াছি কামজ্বরে বড়োই কাতর,
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।
অঙ্গীকার করিয়াছ যাহা চাহ দিব
এক্ষণে আইস বক্ষে তোমারে লভিব।
অর্ধেক রাজত্ব নিয়ে গোল মিটে যেতো
তোমারে দেখিয়া হই কামেতে পীড়িত।
ছাড়িব না কোনোমতে আমি যাহা চাই
তুমি হে কিশোরী আজো প্রেম বোঝো নাই।
কোথা যাবে কী দেখিবে কী বুঝাবে মন
এ জগতে সবই কন্যা মায়ার বন্ধন।
যাহা দেখো ধূলামাটি দেখিছ অম্বর
সকলি পিঞ্জর কন্যা সকলি পিঞ্জর।
পিঞ্জরে করি যে বাস জগতের রীতি
কেহই স্বাধীন নহি পুরুষ-প্রকৃতি।
আমার পিঞ্জর কাম আমারে যে দহে
তোমার শৃঙ্খল বাজে অহংকারে, মোহে।
বুঝে দেখো বরনারী এ বাক্য আমার
কিছুমাত্র নাহি দাম ইচ্ছা-অনিচ্ছার।
ভোর হয়ে আসে ওই, প্রেম-চক্ষে চাহো
অগ্নিসাক্ষী রেখে করি গান্ধর্ব-বিবাহ।

শুনি রাজসুতা ভাবে ভাগ্যে যাহা লিখা
কটিদেশ হইতে হাতে লইল ছুরিকা।
কহিল জীবন দেহে থাকিতে গুণিন
না দিব আত্মাকে মোর হইতে মলিন।
হয় আত্মঘাতী হই নয় তুমি মরো
কিছুতে পাবে না মোরে যতো জোর করো।

বিদ্যাবতীর কটুকথা শুনে গুণিন রাগে জ্বলতে লাগল। ক্রোধে ফুঁসতে লাগল সাপের মত। এতো অহংকার, এতো দর্প! হলো বা রাজকন্যা, সুন্দরী যুবতী। আমাকে প্রত্যাখ্যান করে! এর দর্প আমি ভাঙব। এই নারী আমার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইবে, আমার দাসী হয়ে থাকবে। যা বলব তাই করবে। কিন্তু গুণ করে নয়। মন্ত্রবলে নয়।

তখন গুণিন তার শ্রেষ্ঠ বন্ধনকে স্মরণ করলে। বাঁধন এসে রাজকন্যার হাতে পায়ে জড়াল। সেই নাগপাশে বিদ্যা চলচ্ছক্তিরহিত হয়ে পড়ল, হাত থেকে খসে পড়ল তার ক্ষুরধার ছুরি।

রাজার নন্দিনী তারে হয়ে রুদ্ধগতি
ছাড় ছাড় বলি করে কতো যে মিনতি।
দয়া করো যেতে দাও কহে বিদ্যাবতী
গুণিন কিছু না শুনে ক্রোধে অন্ধমতি।
হায় রে কঠোর তার গলিল না প্রাণ
শত উপরোধে তবু রহিল পাষাণ।
ডাকিনী মন্ত্রের বলে চক্ষের নিমেষে
কন্যারে লইয়া গেল রাজপুরী-পাশে।
রাজসভা-মধ্যে তারে টানিয়া ফেলিল
দেখিয়া সকলে অতি বিস্ময় মানিল।
রাজা বলিলেন তুমি যে হও সে হও
আনিয়াছ কন্যা মোর অর্ধরাজ্য লও।
আরো দিব এই কন্যা সর্বগুণান্বিতা
রাজপুরে সুখে রহো হইয়া জামাতা।
গুণিন কহিল রাজা জনান্তিকে কবো
তোমার জামাতা আমি কভু নাহি হবো।
কারণ বলিলে মোর প্রাণনাশ হয়
রাজা কহে বলো বলো দিনু যে অভয়।
গুণিন কহিল তবে শুন হে রাজন,
কন্যাটি কুলটা আমি করেছি গণন।
কোন সতী কুলবতী ত্যাজি পিতৃগৃহ
অরণ্যে ভ্রমণ করে একা মোরে কহো!
এই কন্যা তুমি বলো বিবাহ করিতে
তার চেয়ে শূলে দাও সহজে মরিতে।
অসতী পত্নীরে লয়ে নিত্য যে মরণ
একবারই মৃত্যু হবে শূলে হে রাজন।

শুনিয়া লজ্জাতে মুখ নামায় নৃমণি।
রাজসভা গুঞ্জরিত, সবে কানাকানি
করিতে লাগিল যতো পাত্রমিত্র ছিল।
বিদ্যাবতী অশ্রুজলে ভাসিতে লাগিল।
কাতর সুভাষে কন্যা কহিল হে পিতা
কুকর্মরহিত আমি শুদ্ধ সুচরিতা।
বিবাহ করিতে মোর ছিল না যে মন
তারই লাগি পুরী ছাড়ি করিনু গমন।
রাত্রিকালে ছিনু আমি অরণ্যে গোপন
সত্যবৃক্ষ রয়েছেন তিনি সাক্ষী হন। 

তখন নৃপতি চাহি কন্যারে দেখিল
ক্রোধে যেন চোখে রক্ত ঝরিতে লাগিল।
গম্ভীর ভয়াল কণ্ঠে কহিল রাজন
দুধ দিয়া কালসর্পী পুষেছি এমন!
তোর লাগি হেন দিন হইল দেখিতে,
বংশে দিলি কালি তোর মুখ না দর্শিতে
চাই কভু, ছি ছি যাই লজ্জায় মরিয়া!
জন্মিতে মারিতে হতো নুন-তূলা দিয়া।
কোথায় কোটাল আছো পাইক-পিয়াদা
ধড়-মুণ্ড এইক্ষণে করহ আলাদা।

রাজরানী উপস্থিত ছিল যে আড়ালে
শুনি করে আর্তনাদ রাজ-পদতলে।
একমাত্র কন্যা রাজা দয়া করো মোরে
প্রাণনাশ কোরো না হে দাও কারাগারে।
প্রতিজ্ঞা করহ যদি দিব যে জীবন
কভু নাহি করিবেক ও মুখদর্শন,
কহে রাজা শুনি সবে হলো স্তব্ধবাক
গুণিন হাসিয়া কহে অর্ধরাজ্য থাক।
মোর কর্ম হইয়াছে এবে সমাপন
ধন্য ধন্য বলি তোমা শুন হে রাজন।

অতঃপর রক্ষী এসে বিদ্যারে বাঁধিল
আমৃত্যু তাহারে রাজা কারাগারে দিল।
শপথ করিল দোঁহে তার পিতামাতা
দেখিবে না ইহকালে কলঙ্কিনী সুতা।
তাহার লাগিয়া রাজা তালবৃক্ষ-প্রায়
স্তম্ভ গড়ে দিল এক প্রাকার-চূড়ায়।
তার উপরে বানাইল বন্দিনীর ঘর
ছিদ্রমাত্র নাই তাহে গবাক্ষ দুষ্কর।
সেই ঘরে বিদ্যাবতী বন্দিনী রহিল
অন্নপান ব্যতিরেকে কিছু না মিলিল।
ছিল যে চক্ষের মণি দেখো আজ তায়
বাপে না তাকায় তারে মায়ে না শুধায়।
কেমনে ভুলিল বলো বক্ষের নিধিরে
কী দারুণ দুঃখ দিল আহা রে বিধি রে!

তৃতীয় পর্ব

এমনি করে কারাগারে অন্ধকারে মাস যায় না বৎসর যায় কাল বুঝি আর কাটে না। বিদ্যাবতী একাকিনী, কখন দিন হয়, কখন বা রাত্রি আসে, বুঝতেও বুঝি পারেন না। রাজা এক দাসী দিয়েছেন বোবা-কালা, সে দিনে দু'বার দু'মুঠো খাবার দিয়ে যায়, ডাকলে ফিরেও দেখে না।

বিদ্যা কি কাঁদেন? নাহ্, কতোকাল গত হয়েছে, বিদ্যাবতীর চোখের জল শুকিয়েছে, কাকুতিমিনতি ফুরিয়েছে। বিদ্যা বেণী বাঁধেন না, চুলের কাঁটা দিয়ে অন্ধকারে বন্দীশালার দেয়ালে নিজের কথা লেখেন। পুরনো বিদ্যা অভ্যাস করেন, নিজের সঙ্গে নিজেই আলাপ করেন, স্মৃতি থেকে কাব্য বলে নিজেকে শোনান। শুনতে শুনতে চোখে জল আসে। অন্ধকারে, বিদ্যা কি কাঁদেন? ধীরে ধীরে কক্ষ নিঃশব্দ হয়ে আসে, শিথিল হাত থেকে কাঁটা খসে পড়লে রিননন করে বাজে, মনে হয় যেন গতজন্মের কোন নূপুরের গুঞ্জরণ। 

কন্যা উঠে বসেন আবার, ভাবেন, আজ রোহিতাশ্ব কি ডাকেনি? তবে কি আজ দিন হয়নি? 

প্রতিদিন, রোহিতাশ্ব তার কারাগারের চারপাশে ঘুরে যায়, উচ্চৈঃস্বরে তাকে ডাকে। সেই ডাক শুনে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে বিদ্যাবতী চুলের কাঁটা দিয়ে পাথরের দেয়ালে একটি আঁচড় কাটেন আর গোণেন। আজ ঊনপঞ্চাশ, কাল বাহাত্তর, পরশু নব্বই। 


দেখিতে দেখিতে গেলো কতো দিনক্ষণ

বিদ্যাবতী কারাগারে বন্দী হয়ে র'ন

কাটিল ক্রমেতে কাল তিন মাসাধিক

গুণিন ভাবিল মনে এতোদিনে ঠিক

বুঝিয়াছে বিদ্যাবতী করিয়া নিশ্চয়

আমি ছাড়া অগতির গতি কেহ নয়

আমি ছাড়া ইষ্ট তার কেহ নাহি ভাবে

এবে সেই দর্পশীলা চরণে লুটাবে

কারামধ্যে গিয়া তারে দিব দরশন

মোর লাগি সে করিবে কতো যে যতন 

কান্দিয়া পড়িবে কন্যা ভূমির উপরে

তখন উঠাব তারে কতো স্নেহভরে

অনাথারে ক্ষমা করো নাথ, করো দয়া

বলিয়া মাগিবে ভিক্ষা রাজার তনয়া

তখন আদর করি মুছাইব তার

কোমল কপোল হতে অশ্রুবারিধার


to be continued

ছবি : রেনেসাঁ

Comments

Unknown said…
Taratari dao porer angsho. Aha boro bhalo

Popular Posts