লীলাবালি ৩ ত্রিধামূর্তি

কথোপকথনমূলক একটি বাক্যাংশ লিখব বলে আমরা রুক্ষ বন্ধুর এই পার্বতীপুর বেড়াতে এসেছি। এখানে, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, বাঁদিকে একটি পুড়ে যাওয়া পাহাড়। এর সমস্তটা জ্বলে গেছে, পোড়া ঘাস, পোড়া পাতা, স্পর্শমাত্রে ভঙ্গুর কিছু ছিন্ন শব্দাবলি এর দেহের ওপর আলগোছে পড়ে রয়েছে। এইসব শব্দকে, ধ্বনিগুলিকে আমরা খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণ করতে পারব না, দুঃখিত, কারণ আমাদের কাছে কোনো দূরবীন নেই, সঙ্গে নেই কোনো অণুবীক্ষণ যন্ত্রও। কিন্তু, কী আশ্চর্য, দেখুন, এই পাহাড়চূড়ায়, আমাদের সামনেই, বাতাসে উড়ছে আধপোড়া সেগুনপাতার মতো কিছু সময়। কী অদ্ভুতভাবে একটা আনমনা ঘূর্ণি হাওয়া যে আসলে ঠিকই করে উঠতে পারেনি সে কেন বা কখন, পোড়া পাতাগুলোকে ভাসিয়ে ভাসিয়ে ইচ্ছেসুখে ছুট্টে যাচ্ছে এই কালো পাহাড়ের এক ধার থেকে অন্য ধারে। লক্ষ্য করুন, কালো রঙের পাতাগুলোকে দূর থেকে দেখাচ্ছে যেন ডানা ছড়িয়ে উড়ে বেড়ানো চিল বা শিকরে বাজ, যেন ওদের ইচ্ছে বা সম্মতি দুটোই  বুঝে নেওয়া হয়েছিল উড়ে বেড়ানো বিষয়ক। আসলে তো, বুঝতেই পারছেন, সেরকম কিছুই ঘটেনি। আপনারা তো জানেনই, এই দাহগুলি, এই ইতস্তত বিচরণগুলি কারো নশ্বরতার অভিব্যক্তি হয়ে ওঠা কতোটা অপ্রয়োজনীয় হতে পারে।

দেখুন, ঘূর্ণিটা এবার কিন্তু সরে যাচ্ছে, দেখছেন? পাহাড়টার মাঝখান বরাবর হঠাৎ একটা আঁকাবাঁকা চিড় তৈরি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না, দেখুন তো? হ্যাঁ, ঠিকই, ঠিক তাই, পাহাড়টা মাঝখান থেকে তিন টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে। আমরা দাবী নিয়ে বলতে পারি, আপনারা এরকম আশ্চর্য ঘটনাবলি আগে কখনোই দেখেননি। লক্ষ্য করুন, এই ভেঙে যাওয়ার কোনো শব্দ নেই, এ নিরুত্তর এবং নিষ্ক্রিয়। আসলে, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে যে অন্যান্য পাহাড় ধসে পড়লে মহীরুহপতনের শব্দ হয়, অবিমিশ্র কান্নার উলুধ্বনি ছড়িয়ে যায় শিকড়ে শিকড়ে। আমাদের এই পাহাড়টিতে কোনো সবুজের লজ্জাবাস না থাকায় এ এইরকম নির্লজ্জ উদাসীনভাবে ভেঙে গেল। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ফাটলগুলো এইবার সানুদেশ অতিক্রম করে নীচে নদীতীরবর্তী সামতলিক স্থান পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিস্তৃত হয়েছে।

আচ্ছা, একটানা কাঁপা কাঁপা দীর্ঘশ্বাসের মতো কী একটা শব্দ এতোক্ষণে উঠে আসছে, ওই অন্ধকার গভীর ফাটলের ভিতর থেকে চিরে চিরে, ফুলে ফুলে, জলোচ্ছ্বাস নয়, ভালো করে শুনুন, কে যেন বলছে আহা, আমার সোনা মা রে, বড়ো কষ্ট পেয়ে চলে গেলি। পের্সেফোনে, আমার রোদের শিশু, পরিযায়ী ফুল, আমার সবুজ ধানবেলা, এতো অল্পে বারবার কেন তোর সময় ফুরায়। নয়মাস পড়ে থাকি হাঘরের মতো, নিরন্ন বাথান। স্বহস্তে ছিন্ন করি নাভিফুল, বারম্বার, আর তো পারি না। আর তো পারি না মা গো, এইবার আমিও ঘুমাবো।

ওহো, কী ঘটছে দেখছেন? হু হু করে নদীর জল প্রবল গতিতে এসে ঢুকে পড়ছে ফাটলগুলোর মধ্যে। উচ্ছল তরঙ্গায়িত জলরাশি মহাকল্লোলে গম্ভীর নাদশব্দে প্রবেশ করছে পাহাড়ের গর্ভের ফাটলে। আমাদের এই একটু আগে দেখা পাহাড়টা কিন্তু আস্তে আস্তে কেমন ডুবে যাচ্ছে জলের তাড়সে। খুব দ্রুত ঘটছে ঘটনাগুলি, এই এখনই অর্ধেকের বেশি নেই হয়ে গেছে পাহাড়টা। জল ক্রমশ: ওর পোড়া কাঁধ ছাপিয়ে উঠছে, ঘোলাটে ফেনার ওপর ইতস্তত ভাসতে দেখা যাচ্ছে কালো কালো পোড়া পাতা ছাই। এই যে, ভাঙা চূড়া তিনটেও প্রায় ডুবে গেল নিঃশব্দে, এখন শুধুই মাটি আর কাদা আর জলের ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছে তিনটে ধারালো ভাঙা পাথরের বিদ্রূপ।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হলেও এখানে আসা কিন্তু আমাদের পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। সংঘটিত দৃশ্যাবলি মনোরম না হলেও আমরা বহুদিন অবধি কিন্তু বলতে পারব, আমরা একটা ঘূর্ণি দেখেছি পোড়া কালো পাতার, আর দেখেছি একটা পাহাড়কে তিন' টুকরো হয়ে ভেঙে যেতে।

৩১/০১/২০১৮

ছবি: পিয়েতা, মিকেলাঞ্জেলো।

Comments

Popular Posts