কিসা
অশোকগৃহ থেকে মুষ্টিমাত্র সর্ষের অভাবে
পুত্রদেহ কোলে করে এসেছি শ্মশানে।
বাছার বৎসরকাল পূর্ণ হয় নাই।
নবনীততনু তার সর্পবিষে তখন নীলাভ যেন,
ঈষৎ কঠিন।
সঙ্গে এনেছি শুধু বিশুষ্ক প্রজ্ঞান, জেতবনে আর সব অপ্রতুল বড়ো।
তাই দিয়ে বীতরাগ চিতাটি জ্বালিয়ে
মনে ভাবি, সঙ্গে যাই। যাওয়া তো হলো না।
কঠিন মৃত্তিকাবক্ষে অতঃপর সকুণ্ঠিত সায়াহ্ন ঘনায়।
তথাগতশোক এসে দাঁড়ান শিয়রে
মৃদুকণ্ঠে ডাক দেন, কিসা! কিসা গোতমী!
চমকে উঠে বসি। তিনি
মাথায় হাত রেখে বলেন
ওঠো, ওঠো মাতঃ,
আমি সেই গৃহের সন্ধান দিতে এসেছি
যেখানে কখনো কোনো মৃত্যু আসেনি
যা মারস্পর্শরহিত, অশোক।
আমি তার শান্তসিত করপদ্মে মুখ লুকাই,
আমার চোখের জলে ধুইয়ে দিই তার কৃচ্ছাশীর্ণ দু'টি পা।
তার অম্ভোজকেশরতুল্য কোমল কাষায়বস্ত্রের প্রান্ত আকর্ষণ করে বলি
হে শোকসোতাপন্ন, হে কল্যাণমিত্ত, হে ভগবা, ওই দেখুন, আমার ছেলের প্রোজ্জ্বল চিতা।
ওর কিশলয়কিশোর দেহে মাতৃস্নেহজাত এতো দাহ্য ছিল, আমিও বুঝিনি।
তিনি আমার হাত ধরে তোলেন, ধীরে ধীরে নিয়ে যান চিতাপার্শ্বে, পাষাণবেদীতে।
তার করুণ করাঙ্গুলি আমার চোখের জল মুছিয়ে দেয়,
তিনি আমার জ্বরসমতপ্ত ললাট চুম্বন করেন।
পুনর্বার মৃদুকণ্ঠে বলেন, মাতঃ, এ জগতে বীতশোক কিছু নাই, মাতৃগর্ভ ছাড়া। এসো, মা গো, পুনঃপ্রাণা হও।
আমি স্থিরা হই, অবিবদমানা হই।
তিনি আমার নীবিবন্ধ উন্মোচিত করেন
আমার নাভিমূল স্পর্শ করে বলেন
যা প্রাণ, তা শোক
যা জন্ম, তা শোক
আমি এই শোকবীজ তোমাতে রোপণ করি
তুমি শোকধারণ করো
প্রসীদ, প্রসীদ মাতঃ
প্রসীদ বিশ্বেশ্বরি পাহি বিশ্বম
তখন আকাশে জ্বলে সূর্যাস্তের চিতা
পাশ থেকে আগুনের লেলিহান স্ফুলিঙ্গ ওড়ে, চড়পড় শব্দ করে পুড়ে যায় হাড়, চুল, মজ্জা, দেহরস
আমার শিশুর
মাংসপোড়া সুগন্ধ ছড়িয়ে যায় গোধুলীবাতাসে
ক্রন্দসী জুড়ে রোল ওঠে
প্রসীদ বিমুত্তচিত্তা,
প্রসীদ,
প্রসীদ জগজ্জননি পরা
৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
Comments