ডাক

তিনি ফিরছেন।

তার চলার পথের দু'পাশে ঘুমিয়ে রয়েছে জোয়ার-বাজরীর রুক্ষ মাঠ। মাঝেমাঝে উড়ছে দীর্ঘনিঃশ্বাসের মতো লাল ধুলোর ঘূর্ণি।
শুকনো, আতুর হাওয়ার সামনে নতশাখ, বিব্রত পলাশ।

মাটি থেকে শস্য চলে গেছে।
মেঠো ইঁদুরের দল উঞ্ছবৃত্তি শেষ করে কতো যুগ আগে
ফেলে গেছে অতিক্ষুদ্র আণবিক নখরের দাগ।
এখন শুধুই
অনাবৃতা, অবীরা পৃথিবী।

মাথার ওপরে জ্বলছেন মিত্র।
তীব্র নিষ্ফল রোষ তার
আছড়ে পড়ছে অতিক্ষুব্ধ বন্ধুর ভূমিতে।
দূরে, দিগন্তের কাছে যেন দেখা যায় দূরচ্ছন্দা রূঢ় শৈলরেখা।
এই তীব্র মধ্যাহ্নের বুকের ওপর দিয়ে ধীর, শান্ত পায়ে তিনি চলেছেন।

এখানে অরণ্য ছিল, দুর্গম, সুন্দর।
এখানেই, বনস্পতিযূথে, সবল অটুট ছিল মহাকায় বট।
তার পাশে, কোনোদিন, শ্যামলে মধুরে ছিল মহুয়ার, বাতাপির বন। একদিন পাখিদের, শিশুদের কলতানে এই স্থান মুখরিত হতো।
আজ কিছু ভগ্ন, ক্ষীণ কুটীরের বিস্মৃতির ছায়ারা রয়েছে।

তিনি ডাকলেন ধীর, শান্ত স্বরে, ইল্বল!
সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ল শ্বাসের মতো, ক্রমানুরণনে বাতাসে, ধুলোয়, মাটিতে, ভুলে যাওয়া বনস্থলীর প্রগাঢ় গভীরে।
সেই অন্ধকারে
যেইখানে চাঁদ নেই, সূর্যে আলো নেই
নিষ্প্রদীপ, অগ্নিহীন, সতত তমস
সেইখানে
কেঁপে উঠলো মাটি
কেঁপে উঠলো পাথরের ভিতর পাথর
ন্যুব্জ, শীর্ণ, কঠিন, দারুভূত শিকড়ের মতো এক বৃদ্ধ
উঠে বসল ধুলোর ওপরে।
কম্পিত, অবরুদ্ধস্বরে বলে উঠল, মৈত্রাবরুণি!

তিনি বললেন,
ওঠ, ডাক পাঠা। ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নিবি চল। সময় হয়েছে।

ধুলোর ঝড়ের মুখে শুকনো পিয়ালপাতার মতো দিগন্তে ছড়িয়ে গেল সেই ডাক।
আয়, আয়, আয় তোরা, তিনি ফিরছেন, ফিরে আসছেন, এসেছেন মৈত্রাবরুণি।

তিনি এগিয়ে চললেন গঙ্গাতটের দিকে।

তার পিছনে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়ালো
কালো মানুষের পাহাড়।

#
#

টীকা: মৈত্রাবরুণি হলেন অগস্ত্য ঋষি। পুরাণমতে ইনি পরমপ্রতাপ অসুর রাজভ্রাতৃদ্বয় ইল্বল এবং বাতাপির মধ্যে বাতাপিকে হত্যা করে ইল্বলের ক্ষমতা চূর্ণ করেন। ইনি বিন্ধ্যপর্বতের গুরু, পর্বতশ্রেষ্ঠ বিন্ধ্য এঁকে দেখে মাথা নিচু করলে ইনি আদেশ করেন যেন তিনি না ফেরা অবধি বিন্ধ্য নতমস্তকেই থাকেন। এই আদেশ করে তিনি দক্ষিণে চলে যান, আর কখনো উত্তরে, আর্যাবর্তে ফেরেননি। দক্ষিণে, বিশেষ করে তামিলদের কাছে তিনি অতিপ্রিয়, আগাথিয়ার নামে পূজিত।

Comments

Popular Posts