লাল নীল বাড়ি ও তপতী
বজ্র
সারাদিনে আমার কাজ বলতে তিনটে। এক, স্টেশন রোডে অটো নিয়ে গুলতানি; দুই, সাড়ে চারটে থেকে সাড়ে ছটা সরযূবালা কলেজ থেকে স্টেশন কলেজ থেকে স্টেশন ফেরি; আর তিন, রাত সাড়ে দশটায় সূর্যসমকে স্টেশন থেকে কোলপাঁজা করে নীলবাড়ির দোতলায়। প্রথম দুটো না করলেও চলে যেত। পততি আমাকে ছ'হাজার দেয় মাসে। সূর্যসম-ও মাঝে মাঝে দু'একশো ভুল করে বার করে দেয়। ঘাড় জড়িয়ে ঝুঁকে দাঁড়ায় যাতে ওর নিখুঁত খাঁজকাটা থুতনি, যাকে চিবুক-ই বলা উচিৎ, আমার কাঁধে বিঁধতে থাকে।
"এই যে তুই, বুঝলি, শালা অটো চালাস, অটোওয়ালা, মাইরি, পতী তোকে বিশ্বাস করে। তোকে, শালা, র্যালা মারা তুই। কিন্তু, শালা, আমাকে করে না। বিশ্বাস কর, বোজো,পতী আমাকে একদম বিশ্বাস করে না।"
দোতলার বারান্দায় পততি এসে দাঁড়ায়। ও ঠিক নিয়ম মেনে সাতটায় বাড়ি ফেরে। রোজ দেখি স্টীল গ্রে রঙের ইন্ডিগোটা সাঁক করে ঢুকছে লাল মোরাম মাড়িয়ে। সূর্যসমকে হ্যান্ডওভার করে আমার ছুটি। পততি আমাকে দেখে না। তাকায় না। কিছু বলার থাকলে পরিশীলিত ঠান্ডা গলায় বলে যায়। আমি শুনি। ওর বাবাটা নির্ঘাত গাধা ছিল। পততির নাম হওয়া উচিৎ ছিল প্রিয়া, চারুশীলা, মেঘবতী, মধুরা, মণিকঙ্কণা--! তা না, তপতী! দরজার ফ্রেমে আঁটা থাকে মেয়ে। আমি দেখি। অমন জলপাই রঙ! ওই চোখ! কিম্বা চিত্রার্পিতা! আচ্ছা, চিত্রার্পিতা কি কারো নাম হয়?
তুমি ওকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নেবে বজ্র। নয়তো কোনোদিন ও হয়তো নামবেই না. ভুলেই যাবে। তুমি রোজ একটা প্লাটফর্ম টিকিট কেটে দশটা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত স্টেশনেই ওয়েট করবে। ও এলে ওকে নামিয়ে নেবে। শেষের কামরাটাতেই থাকবে ও। ড্রাইভারকে বলা আছে, ওকে রোজ তুলে দিয়ে যাবে। তুমি শুধু নামিয়ে নেবে।
সাদার ওপর গোলাপী রঙের ছিটছিট ফ্রক পততি যেদিন আমাদের বাড়ি প্রথম এসেছিল শিউলি ফুল নিতে, দাদুমশায় জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কি গো ? সঞ্চারিনী পল্লবিনী? ও গম্ভীর মুখে বললে, তপতী। দাদুমশায় বললেন, বজ্র, এই দেখ, এ হল তপতী। কিন্তু সেদিন আমার জিভে জড়াল। মনে পড়ল, দাদুমশায়-এর গলায় "পততি পতত্রে বিচলিত পত্রে শঙ্কিত ভবদুপযানম"।আমি বললাম, বেকুবের মতো, পততি। সবাই হেসেছিল। আমি আর পততি বাদে। কিন্তু ও সেই পততিই রয়ে গেল। পততি।
বোজো শালার নেম ফেটিশ। দাদুমশায়ের কাছ থেকে কী পেলি রে শালা খুদুচাট্টা ? দু’চার গাল ইঞ্জিরি আর নামের ব্যাখ্যানা। বজ্র! দাদুমশায় বিশেষরকম চন্দ্রাহত ছিলেন। শরৎকালীন উভয়প্রকার চন্দ্র, চট্ট ও বন্দ্য, তাঁহার মস্তিস্কটিকে গজভুক্ত কপিত্থবৎ ফোঁপরা করিয়া তুলিয়াছিলেন। তাঁহার তুলারাশির জাতিকা কন্যার নাম রাখিয়াছিলেন রঙ্গনা। দৌহিত্র, মানে আমি, মীন রাশিতে জাত হইলে আমার নাম হইত চিত্রক। কিন্তু কপালগুণে আমি বৃষ রাশিতে আবির্ভূত হইলাম। এবং আমার নাম হইল বজ্র।
শিকড়-বাকড়ে জড়ানো, অশ্বত্থ্বচারা গজানো পোড়ো লালবাড়ির একমাত্র ইজিচেয়ারে বসে দাদুমশায় আমাকে ডাকতেন, মাঝে মধ্যে, মহারাজ বজ্রদেব। বোন জন্মাবার পর দেখা গেল তারও তুলারাশি। দাদুমশায় একরাশ হেসে আমার পিঠ চাপড়িয়ে দিয়ে বললেন, বজ্রদেব, ভাগ্যিস! তোমার নাম যদি চিত্রক দিতুম ভায়া, তাহলে তোমার বোনের জন্য এত ভালো নামটা হাতছাড়া হয়ে যেত! ওর নাম হলো রট্টা! রট্টা যশোধরা!
হলও তাই। দাদুমশায়ের ওপর আর কে কী বলবে! ছোট্ট বোনটা প্রথম থেকে গুটিয়ে রইল নামের ভারে। লাজুক। মুখচোরা। ও বোধহয় স্বপ্নেও কখনো ঘোড়ায় চড়েনি। আমরা অবিশ্যি ওকে রাতা বলে ডাকি। আমি যেমন এখন বোজো। সবাই বলে। মাও। পততি বাদে।
পততি! আমরা এক ক্লাসে এক সেকশনে পড়তাম। পততি, তোর মনে আছে, আমরা দুজনেই ভালো ছিলাম পড়াশোনায়। দাদুমশায়কে তুই কত ভালোবাসতিস পততি। রোজ আসতিস। গীতা থেকে গীতগোবিন্দম। মালতীমাধব। মৃচ্ছকটিক। অস্কার ওয়াইল্ড। বায়রন। ক্লাস সিক্সে তোর কোমর-সমান বেণী। সূর্যসম আমাদের চেয়ে তিন বছরের বড়ো। টিফিনে বেরিয়ে ফুচকা খাবার সময় তোর বেণী ধরে টেনেছিল বলে একটা আধলা দিয়ে ওর কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিলাম। আজো সে দাগ আছে। রোজ দেখতে পাই। পঞ্চাশ ঘা বেত খেয়েছিলাম। তুই, পততি, লাল চোখ ফোলা ঠোঁট নিয়ে দাদুমশায়কে গিয়ে বলেছিলি, বজ্রকে সুবিমল স্যার কিভাবে মেরেছে!
দাদুমশায় হেসে বলেছিলেন, বজ্রদেব, যাও আজ থেকে তোমার নাম হল মধুমথন!
সূর্যসম
পতী আর সাড়া দেয় না। মারলেও না। ওকে বলি, পতী, কী সন্ধ্যেবেলায় গুটি গুটি বাড়ি আসো সোনা ? লাইফটা এনজয় করতে হয়। বি হ্যাপি ইয়ার! তুমি ঠান্ডা মেরে যাচ্ছ। দু'চারটে পরপুরুষ ঘাঁটো না সখী! আমাকে তাপ্পর বেশ বলবে। আমি শুনব! আমার কলিগগুলো পতী। একবার তোমাকে পেলে বর্তে যেতো শুয়ারগুলো! শালা, তোমাকে দেখলেই জিভ দিয়ে লাল গড়ায়। কিন্তু তুমি পাত্তা দিচ্ছ না কাউকে সোনা। এ সব ভালো কথা না! এ সব মোটেও ভালো কথা না।
পতী আমার টেম্পারেচার মাপে নির্লিপ্ত মুখে। আজকাল প্রায়ই রাতে আমার জ্বর আসে। কেন কে জানে। আমি বুঝি। সব বুঝি। পতী আর ভালোবাসে না আমাকে। হা হা! সূর্যসম! তুমি শুয়ার একটা শুয়ারের মতো কথা বলছ। পতী তোমাকে কবে ভালোবাসত হে? বল্ না রে হারামজাদা? চুপ করে গেলি কেন? সূর্যসম! নীলবাড়ির সূর্য। আহা, সূর্য আমাদের সোনা। ছোট্ট সোনা। সূর্য সোনা গাড়ি নেবে। ঘোড়া নেবে। বই নেবে। মেডেল নেবে। পতী নেবে। পতী কে ? না, তপতী। লম্বা চুলের রাপুনজেল। পতীর বেণী দেখলেই টানতে ইচ্ছে করত যে! আর ওই শালা বোজো! এখনো দপদপ করে। তখনই তোমার বোঝা উচিৎ ছিল সূর্যসম, তোমার কপাল ফাটা! হা হা! যতই তুমি বুলি কপচাও, তোমার কপালটি ফাটা!
আহ্! মাঝে মাঝে ভাবি পতী যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়? যদি বোজোর সঙ্গেই যায়? আর গিয়ে লালবাড়িতে থাকে? আর বোজোকেই ভালোবাসে? তাহলে? তাহলে তোমার কী হবে হে সূর্যসম? তুমি কী করবে হে বাবা পুরুষোত্তম? মদ খাবে? তুমি কি খুব মদ খাবে? একরাশ গিলে বোজোর বাড়ির সামনে গিয়ে গান গাইবে? কী গাইবে? কে গান শুনবে হে তোমার? কতকাল তুই গাস না সূর্য! কতকাল তোকে কেউ গাইতে বলেনি! কারো কি মনে আছে তুই গাইতিস? তুই না গাছের মতো, পাতার মতো গাইতিস? সবুজ সবুজ পাতার মতো বৃষ্টির গান। টুপটাপ টুপটাপ টুপ টুপ। অাহ্ বৃষ্টি!
এই রে, শালার গুলিয়ে যাচ্ছে সব- ঘেঁটে যাচ্ছে মাথা। দোতলায় উঠবো কী করে? এ যে সিঁড়ি বেড়েই যাচ্ছে - বেড়েই যাচ্ছে রে বাবা? ওই দেখ - ওই ক-ত্তোদূরে ওই ওপরে পতী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। হাতটা দাও না পতী? পড়ে যাচ্ছি যে! দেবে না! ঠিক আছে! আমিও তাহলে পড়েই যাব। পড়ে পড়ে গান গাইব। চুপ! এই সব্বাই চুপ করো - রাজামশাই গান গাইবেন। কে রাজা? অন্ধকারের রাজা। পতী তোর শাপমোচন মনে আছে? সেই যে ইস্কুলে ড্রামা হযেছিল? পতী তো রানী সাজে নি। কে যেন একটা ফরসা মতো মেয়ে রানী হয়েছিল। বিতিকিচ্ছিরি একটা ঢোলা ব্লাউজ পরিয়েছিল ওটাকে। পাশে দাঁড়ালেই বুক দেখা যাচ্ছিল। খুব দেখছিলাম। খুব। মেয়েটা কি টের পেয়েছিল?
না না - পতী, মেরো না লক্ষীটি। দেখ আমি ক-ত্তো ভালো হয়ে গেছি! আমার মতো ভালো ছেলে তুমি আর পাবে না সোনা। ছেড়ে চলে গেলেও পাবে না। পতী ছেড়ে চলে যাবে! যদি চলে যায় ? এহ্! ঘুরে ঘুরে মালটা একই চক্করে। নাহ্! সূর্যসম, তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না। এত গিলিস কেন হারামজাদা হজম করতে পারিস না যখন? সেই তখন থেকে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিস তো উঠছিস - উঠছিস তো উঠছিস! কি ভেবেছিস? পতী কি সারারাত তোর জন্যে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে? সোনা আমার! পতী কি তোর জন্যে দাঁড়িয়ে থাকে রে শুয়ার? ও তো বোজোর জন্যে দাঁড়ায়। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে না। কিন্তু মনে মনে তাকায়। নিশ্চই তাকায়। তাকায় আর কী করে ? পতী, তুমি মনে মনে বোজোকে কী করো সোনা? আমার খুব শুনতে ইচ্ছা করছে। দেখতে ইচ্ছা করছে। বোজোটা ভ্যাবাচ্যাকা মেরে দাঁড়িয়ে আর পতী ওকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। আঙুল দিয়ে, চোখ দিয়ে, নাক দিয়ে! ইসস - বিকট গন্ধ একটা। কে যেন এসে দাঁড়িয়েছিল ট্রেনের দরজার কাছটায় - ছাগলমরা গন্ধ - আমার বমি পাচ্ছে। পতী ওকে শুঁকে শুঁকে দেখছ কেন সোনা? আহ্! বমি পাচ্ছে - বিশ্রী বমি পাচ্ছে। আর পারছি না!
তপতী
বাণিজ্যপ্রভায় এসে সৎসঙ্গ ক্রমশ: ভুলেছি
গন্ধের জলছবি শব্দছক ভাঙ্গা বিজ্ঞাপন
সিঁদুরে আবিল ঠোঁট আনমনে পোড়ানো দুপুর
সবই যদি সত্যি হলো, হে গুণিন, তবে কেন ঝড়?
অজস্র পুরুষ এসে ঠোকরায়, ছেঁড়ে বটফল
খাবারে ও খিদেতে কী সমন্বয়! শ্রেষ্ঠ দ্বিজবেশ
উত্তরীয়ে অনশন, যাবতীয় উপরোধ, বীণা
প্রহরে সুরের দাগ, তবু জানি, তোমাকে চিনি না
ক্রিয়াবিদগ্ধার ঋতি। বিনোদনে ক্লান্ত নটীবেশ
কাঁটায় কাঁটায় কাল ঝরে গেছে প্রত্যাখ্যানগুলি
শরীরে মুহূর্ত গোণে নষ্ট মেয়ে, গুণে গেঁথে রাখে
পরে কিম্বা তারো পরে, দেখা হলে, ভালোবাসা নিও
আরতি লঙ্ঘিত হলো। অনভ্যস্ত দিবি আরোহণে
বহুমূল্য অবহেলা সাধ্যমতো আয়াসে কিনেছি
জঠরে প্রসন্ন বীজ, অনটনে শতধা শরৎ
এসো শেষ মাল্যদানে, হে দয়িত, নয়নাভিরাম
Comments