চালকাহন
১ কনকাঞ্জলির বাসি চাল আর খই কুড়িয়ে খাচ্ছে যে রোগা গাঙশালিক তাকে ডেকে বলো বেহায়া, অকৃতজ্ঞ! এইভাবে? একমুঠো চাল? পাখিটা অসামাজিক, মাতৃঋণ বোঝেনি কখনো। ভেবেছিল আজ ফেলে যাচ্ছি পরশু ফিরে এসে ধান পাবো, অন্নভোগ পাবো। ওকে যে কাঁদালে তুমি, কখনো দেখেছ গিয়ে ইস্কুলে কী পড়ানো হতো?
২ ছেলেটা বলছে তাহলে আজই? হয়ে যাক, নাকি? না, না, মনটা ভালোই ছিল, এই একটু গিটার, একটু ভাস্কর বিষাদ। তারপর তো দেখা হচ্ছেই, আঠাশে, সে রাতে বড়ো পরাতের মতো একটা লাল চাঁদ। এইসব থালাবাটি গেরস্থালী ভাবলেই দাঁত কিড়কিড় যেন অনিচ্ছুক চাল, তায় বাড়ন্ত। তার চেয়ে এই একা শালিখের ভোরবেলা ভালো আনমনে চন্না মেরেয়া মেরেয়া, চন্না মেরেয়া।
৩ বৌ, দুটো চাল বেশি নিস, আর বেশি করে মশলা দিয়ে ডাল করিস, বলে পাগল লোকটা গিয়েছিল ঝুপঝুপে বৃষ্টি মাথায় তাড়ি খেতে। বৌ বড়ো লক্ষ্মী, তবু রেঁধেবেড়ে বসলো যখন দুইবারের খণ্ডিতা পায়ে কোমরে কী ব্যথা মাগো। হ্যাঁ গো, কাঠচাঁপার ফল নাকি পাথরেও ফুল আনে, ধারণ করলে অখণ্ডপোয়াতি? ও কী! পাতিল নিয়ে বসলে যে? থালা কই? পাগল শোনে না, এই এতোটি ডালে অতোটি ভাত ঢেলে গোগ্রাসে গিলতে থাকে। শোন্ বৌ, কাছে এসে বোস, আদর করে ভাত বেড়ে দিই, খা। আমি চললাম, অনেক দূর। অনেক খুঁজলাম সেই অখণ্ড ফল যার ভিতর লাল লাল বীজচাল, যা পড়লে অক্ষয় গর্ভ, অঢেল ফসল। বরং এই ভালো, এই খেয়ে নিচ্ছি জন্মশোধ, এই ভাত, ঝালমশলা দেওয়া ডাল, তাড়িতে মেশানো ফলিডল।
৪ শেষ পর্যন্ত ভোর রাতে আসে সেই বুড়ো ঝাড়ুদার। প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল আর দরজা খুঁজে পেতো না এদিক ওদিক শুয়ে পড়ত তাই ওর মাতাল ছেলে বুটপরা পা দিয়ে চোখে লাথি মেরেছিল। বুড়োটার সঙ্গে তাই একটা আধভাঙা ঝাঁটা আর একপেশে একটু গলে যাওয়া একটা চোখ। ও ধীরেসুস্থে কুড়িয়ে নিতে থাকে সেইসব চালের দানা যা শালিখটা খুঁজে পায়নি। ছেলেটাও না। সেই পাগলটাও না। যেটা পায়, আহা, সুর্তি, সুর্তি। এই দানাটা আম্বেমোহর। এইটা বুঝি লালচালের খই। কী সোয়াদ, কী সোয়াদ, ঠাকুর।
৫ এদিকে তার শারদ পত্রিকা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল ডানা মেলে। কিছুই হলো না, রুক্ষ চুল থেকে খসে পড়ল না হলুদের শিকড়, জড়িবুটি। দুধ-মধুতে নেয়ে ঘাটের পৈঠায় উঠে খুঁজে পেলো না জলধানের নাবাল জমি। জাদু আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে গেলো।
আমি না ক্রমশঃ সেই লোকটার মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছি যাকে আমি সব চেয়ে, সব চেয়ে বেশি ভয় করি।
Comments