চিঠি
আচ্ছা শোনো, মরে যাবার আগে বলে রাখা ভালো, এই পুঞ্জীভূত মেঘের মধ্যে যে বিদ্যুৎ দেখছো, একে কিন্তু আমি ডেকে আনিনি। আমি ঝড় পেতে চেয়েছিলাম, অণুস্পর্শে যে তাণ্ডব এলোমেলো লীনতাপ তৈরী করে, আলগা দৌড় দেয় মাঠেঘাটে, অশ্বক্ষুর জলাভূমিতে, তাকে শুধু দেখতে চেয়েছিলাম। মাঝে মাঝে তো শুয়ে থাকতে হয় এই মৃত্তিকাশরীরে হাত রেখে। সবকিছুই কি কালো চামরের মতো কপাল থেকে চুল সরিয়ে দেয়, বলো মুশকিল আসান? এই যে কাষায় আমি মস্তকে ধরেছি, এ আমাকে প্রায়ই বলে, আমাকে দেখো মেয়ে, আমি ত্রিপাদ ভূমি আবৃত করে রেখে দিই; তবুও তোমার সেই উত্তরপাড়া ব্যান্ডেল কাশীপুর মাধুকরী শেষ হলো না তো।
এইভাবে দিন যায়।
এইখানে হলুদ পাপড়ি ছড়ানো পিচরাস্তায় বৃষ্টি আসবো ভাবে রোজই। এই যে বিশ্রীরকম সাইকেলের স্বপ্নগুলো, সব দোষ এদেরই, জানো তো। মনে মনে যে নীল রঙের সাইকেল দুহাত ছেড়ে দিয়ে চালাই আমি, একটা পাহাড়ি ঢাল বেয়ে যার দু'দিকে আজোয়া ক্যালেন্ডুলা ফুল নিজেরাই দোলে আর হাসে, এর চাকাগুলো কি সুন্দর সাতরঙা কাগজের পাখা লাগানো, দেখো প্রাবৃট। এই জল-না-জমা রাস্তায় উড়ে বেড়ানোর সময় সেদিন পকেট থেকে হঠাৎ দৌড়ে পালিয়ে গেলো একটা ছেঁড়া দশ টাকার নোট। সাইকেল থামলো না আমার, তখন গড়িয়ে যাবার বড্ডো তাড়া ছিল তো দুজনেরই। ফিরতি পথে ওই পাথুরে বাঁধের কাছে খুঁজলাম অনেকক্ষণ। পলাশগাছের তলায়, বুনো ডালিয়ার ঝোপে। পেলাম না, জানো তো। তখন বিকেল হয়ে আসছে, স্কুল শেষ করে বাচ্ছারা বাড়ি ফিরছে তাদের সাইকেলে চেপে, হাওয়াকল থেকে ছুটি পাচ্ছে কতো ডেলি প্যাসেঞ্জার। এ রাস্তায় এতো লোক কখনো দেখিনি। তাদের জন্যে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাঠি আইসক্রিম, বুনোকুল, ফুচকা, কাঁচের চুড়ির ঠেলাগাড়ি, টুপি দস্তানা কয়লায় পোড়ানো রাঙালু, পানিফল-ওলারা। তারা সবাই ডাকছে, হরেক মাল দশটাকা, বাবু, দশটাকা। আমাকেও একজন বললো, কী খুঁজছো বলো তো? এই রুপোর জল করা নূপুর নেবে? এই দম-দেওয়া বেগুনী বাঁদর? এই এদিকে কুলফি মালাইও আছে, আছে জিলিপি আর বাদাম-তক্তি। মাত্র দশটাকা, দিদি, নেবে নাকি?
খুব ঘুরলাম, জানো জল। নাগরদোলায় পাক খেলাম বনবন করে। তারপর উড়তে উড়তে নামলাম পলাশগাছের পাশে যেখানে আমার নীল সাইকেল শুয়ে ছিল। ও কিন্তু তখন আর উঠতে চাইলো না। ওর তখন ডানা ভিজে, ভারী। জ্বর হয়েছে ভেবে কপালে হাত দিতে যাবো, দেখি সব সোনা হয়ে যাচ্ছে।
শোনো মেঘ, আজকে অন্তত আমি বলে যেতে চাই যে জানতাম না, আমি জানতাম না উড়ে যাওয়া দশটাকারা জমে জমে পরশপাথর তৈরি হয়।
Comments