কবিকে চিঠি
গোঁসাইএর জন্মদিনে আমার লেখা এই চিঠিটা কোথাও ছাপা হবে না কোনও বইয়ে, বন্ধুরা, এমনকী কোনো ম্যাগাজিনেও নয়।
এ পড়বেনও এই হাতে গোণা আপনারা ক'জন মাত্র। যাকে লিখছি, তিনিও কখনো জানবেন না।
তবু লিখি।
কবি,
আমি তোমার সেই রোগা মা যে তোমার না-খেতে-পাওয়া বোনকে কাঁখে তুলে, না-খেতে-পাওয়া তোমার হাত ধরে কোনোওক্রমে কাঁটাতার পেরিয়ে এসেছিলাম মিশর, যুগোস্লাভিয়া, আলামো, লাহোর, মায়ানমার থেকে, এসেছিলাম সাতচল্লিশে, একাত্তরে।
আমি তোমার সেই বোন যার কেরোসিনে গ্যাসে বারুদে পেট্রোলে আধপোড়া ধর্ষিত মৃতদেহ শ্মশানে শিয়াল কুকুরেরা ছিঁড়ে খেয়েছিল।
আমিই তোমার সেই মেয়ে, কবি, যার জন্যে কারো হৃদি কখনো ভাসেনি কোনো অলকানন্দা জলে, তবু যার ভ্রূণটুকুও রোজ ভাসিয়ে দেওয়া হয় নর্দমায়।
আমি তোমার সেই প্রত্নপিতামহী যার চোখের সামনে তার পুরুষকে, সন্তানকে হত্যা করে, চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল অন্য গণের পুরুষরা।
আমি তার পরেও, আবারও, গম বুনেছিলাম, বন থেকে সংগ্রহ করেছিলাম ফলমূল, কাঠকুটো, চুলে পরেছিলাম বুনোফুলের মালা, সন্তানকে বুকের দুধ খাইয়েছিলাম, সাত সখী মিলে শিকার করে এনেছিলাম বনশুয়োর। চাঁদের আলোয় আগুন জ্বালিয়ে আমরা নেচেছিলাম নতুন ফসলের উন্মাদ গানে, কবি।
তবু, তারপরেও, ওরা আমাকে মারল, বলল, দাসী।
ওরা আমাকে, রূপসীকে ধরে নিয়ে গেল মদনগৃহে, বলল আজ থেকে তুই জনপদকল্যাণী।
ওরা আমার, গার্গীর হাত থেকে কেড়ে নিল পুঁথি, বলল আর প্রশ্ন করলে তোর মাথা থাকবে না।
ওরা কেড়ে নিল আমার, নন্দিনীর লাল ফুলের মালা, আমাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল অবরোধে, হারেমে, হোস্টেলে, অফিসে, বন্ধ কারখানার গুদামে।
ওরা আমার, জ্যোতির অন্ত্র ছিন্ন করল লোহার শূল দিয়ে, বলল এই নে তোর উচিত শিক্ষা।
ওরা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল আমাকে, অনিতা দেওয়ানকে, শিপ্রা ঘোষকে, তাপসী মালিককে, আমারই রুয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে, আমারই আল্পনা-আঁকা আঙিনায়।
আর আমার উমা, কবি? ওরা আমার উমার যৌনাঙ্গে দিনের পর দিন, তারিয়ে তারিয়ে, ঢুকিয়ে দিল অসংখ্য সূচ।
কবি, এখন আমি খুব ক্লান্ত। আমি, আমরা খুব ক্লান্ত, ক্লান্ত, বারবার মরতে মরতে, বারবার ফুরিয়ে যেতে যেতে।
আমরা বিধ্বস্ত, নিরন্ন, ক্ষুধার্ত, আশ্রয়হীন, উপদ্রুত। আমাদের অল্প, অত্যল্প কিছু সময়ের জন্য তুমি শান্তি দিতে পারো?
শোনো,
আহার শব্দটি রাখো আমাদের পাতে,
আমাদের বসত শব্দটি গড়ে দাও।
শোনো, কবি, শোনো,
আরেকবার ঘাতকের সামনে সোজা দাঁড়িয়ে বলো, বলো,
মা নিষাদ, মা নিষাদ, মা নিষাদ
১০/১১/২০১৭
Comments