কাট আপ
১
দুঃখ যেন একটা মা-হারা বাচ্ছার প্রথম ফানুস। দীপাবলির সন্ধ্যায় অনামুখো বৃষ্টি আর সাইক্লোন-পাগল বেসামাল হাওয়ায় ওড়ে কি ওড়ে না, বারম্বার আছড়ে পড়তে চায় উঠোনে, সঙ্গীহারা পাইনগাছে, জামাকাপড় মেলবার তারের দোটানায়। তার কাগুজে চোখের ভিতর জমা হয় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পাতিত বৃষ্টিজল, জলধারা। বুক জুড়ে ধাক্কা দেয় কবোষ্ণ বাতাসের আদর নয়, অনাবশ্যক, অপরিসীম ক্লান্তি আর গুরুপ্রসাদী তিতিক্ষা। তারপর অবসন্ন, হাঁটু ভাঁজ করে বসা তাকে ঘিরে ক্রমশঃ জমে ওঠে করুণার নীলচে পাহাড়।
২
আমি এক রাজকন্যাকে চিনতাম। তার শিয়াল তাকে নিয়ে গিয়েছিল গহীন বনের ধারে আর বানিয়ে দিতে বলেছিল পশুপাখিদের জন্য নতুন হাস্পাতাল। সে তখন গায়ে মাখতে থাকে নিয়মানুযায়ী প্রচুর ময়দা আর তা শুকিয়ে যেতেই, চামড়া থেকে রগড়ে রগড়ে ঝরিয়ে ফেলতে চায় সোনার সর। সে কিন্তু ভুলে গিয়েছিল সেই মধ্যবর্তী ন'বছরের অরণ্যযাপন; তার খোলস, আঁশ। আর ভুলে যাবার ফলেই অসংখ্য রুপোলী আঁশ ঝরে পড়ে গিয়েছিল তার দেহ থেকে। সেইসব আঁশেদের গল্প শোনা যায় এখনো, সেই যারা আসলে সর্পশিশু, গড়িয়ে ইলিবিলি করে ঢুকে পড়েছিল শীতকালে। তারপর, তার জন্য রইল খানিক শীতার্ত পৃথিবী।
৩
এর মধ্যেই আমার অনুচ্চার বালিকা এঁকে ফেলে ঠুঁটো পরী। স্তব্ধ, নিরাবেগ, হাতকাটা পরী। তার কোনো ধরে থাকা নেই। ডানা আছে, উড়ে যাওয়া নেই।
৪
কাট - কাট - কাট আপ - কাট আপ। মাজুনের নীলাভ বেগুনি পর্দা সরে যাচ্ছে আর দেখছি মাচুপিচুর সিঁড়ি দিয়ে আকাশ বরাবর সোজা উঠে এক প্রত্নউদ্যানে মুখোমুখি বসে আছেন উলঙ্গ বারোজ, কেরুয়াক, গিন্সবার্গ; একটু দূরে গিটারে বুঁদ বাওয়ি। চার নম্বর টুলে কোবেইন, তিরিশ বচ্ছর পরে, কিছুটা একা, অবশ এবং প্রচ্ছন্ন।
৫
প্রতিদিন রক্ত মেপে মেপে চিনির যে নিগূঢ় দলিল তৈরি হয়, তার স্বস্তিবাচনের পাশে ডানদিকে লেখা হয় ক্ষুধামান্দ্যের সমষ্টিগত পাপক্ষয়।
দৃশ্যের ওপরে সর পড়ে। স্তর পড়ে।
সেই নির্ভিক্ষার সংসার শূন্যহাতে ফেরালে আমায়।
২০/১১/২০১৭
ছবি: পৃণাকা দে
Comments