লীলাবালি ১৩ মহালক্ষ্মী
#
তোমরা বুঝি দুই বোন? কাল এসেছো সবে?
বোনটিকে দেখলাম, অফিস যাবার পথে, খুব শান্ত মেয়ে
এই একটু পরে আমি-ই তো যাচ্ছিলাম, রান্না সেরে, তোমাদের বাড়ি।
নতুন এসেছো ভাই, একটু চা-টা করে
নিয়ে আসছিলাম দুটো কথা বলবো বলে
তা দেখো কপাল! হায়, দুধ জ্বাল দিতে গিয়ে কেটে গেলো আজ।
কী যে হবে, কী যে করি। আমার উনি তো
সেই কোন ভোরে উঠে কাজে চলে যান। ছেলেও কলেজ গেলো।
মেয়ের ইস্কুল ছুটি। বকে ধমকে পড়তে বসিয়েছি।
দিনরাত শুধু তার খেলা আর খেলা। কিন্তু দেবরজী তো বাড়িতেই আছে।
সেও ছোট, আমাকে মা বলে। তবু তো পরের ছেলে!
দিনে তিনবার, দুধ-চা চাই-ই ওর। এখানে যে'রম খায়, বুঝলে তো,
আদা, ইলাইচি, আর অল্প একটু মশলার গুঁড়ো। জানো তো বহিন,
আমার শাশুড়িমা না এখনো নিজেই
উঠোনে পাতা সে তার বিশাল যাঁতায় সমস্ত মশলা কুটে তৈরী করে রাখে।
সারা বছরের। আমরা যখনই যাই
স্নান করে শুদ্ধ হয়ে আমাদের গোছ করে দেয়।
এই এতো এতো রুপোর চামচ হাতা কৌটো আছে ওর।
এই যদি জানতে পারে, দুধ কেটে গেছে আজ,
কি যে কুরুক্ষেত্র হবে, তুমি তো জানো না!
এ বড়ো অবশগুন, দুর্লক্ষণ, তুমি যাই বলো।
এই দেখো, রামুও এসেছে। কোথায় থাকিস বাছা, সেই ভোর থেকে
ডেকে ডেকে হয়রান হই আমি। এখন এসেছো তুমি ম্যাও ম্যাও করে?
জানো, দুধ কেটে গেছে? কি খাবে এখন?
রও দেখি, কালকের ডাল-ভাত আছে, আপাতত তাই গেলো তুমি। জানো বোন,
এই যে রামুকে দেখছো, এতটুকু এসেছিলো, মা-হারা ছানাটা।
ছেলে আর মেয়ে মিলে বড়ো করলো ওকে।
কী একটা নাম দিলো, রোমিও না কী যে ছাই ভালোই লাগে না
আমি রামু বলে ডাকি। দিব্যি সাড়া দেয়।
আহারে বাছাটা, এও আজ দুধ পেলো না গো।
কী বলছো? প্যাকেট দুধ? সেতো কেউ ছোঁবেই না। আমাদের দেশে
আট-আট গাইয়ের দুধ, গাঁও ভেসে যায়।
সেখানে সবাই, পিত্তলের ঘটি করে তিনবেলা দুধ খায়, জানো।
আমি তো পারি না বাপু, দিনে একবার, এতোটুকু চা হলেই চলে যায় দেখি।
ওই যাহ, দেখেছো! তোমাকে এখনো কিছু খেতেও বলিনি।
ছি ছি, কী হবে আমার! নতুন অতিথি তুমি, এই নাও দেখি,
মুগের লাড়ুই খাও দুটো বোন, কী যে দিই আর!
এই সোনামুগ, এও দেশ থেকে আনা, আমিই করেছি।
সারাদিন এইসব করি, জানো, পড়ালিখা করি নাই তোমাদের মতো,
কতো ভালো লাগে, দেখি তো আপিস যাও কেমন দুজনে!
বিহা করো নাই বুঝি? ভালো বাপু, হাজারো হাঙ্গাম, দুদণ্ড রয়েবসে বেলা পাটে যায়।
ওই দেখো, ভাবী ভাবী বলে, চিৎকার শুরু হলো।
আসছি রে বাবু। কী হয়েছে, সর্দার? চায় পীবে? দুধ নাই জানো?
ভাবীর কাহিল হাল খবরও রাখো না। সেই সন্ধ্যাবেলা
তবেলায় গেলে তবে দুধ পাওয়া যাবে। ততক্ষণ বায়না কোরো না বাছা।
আচ্ছা এই দেখো, এই দিদি আমাদের পড়শী এসেছেন। নমস্তে করেছো?
দিদিজীর মতো, কালো চা-ই এক কাপ খেয়ে দেখবে নাকি?
এই তো আমিও খাচ্ছি, দেখো, ভালো খেতে। সঙ্গে এই নাও,
সকালে নতুন ঘিয়ে কতকিছু বানিয়েছি, চাকলি, বাখরওয়াড়ি, যা যা ভালোবাসো।
দেখো কী যে ভালো ছেলে, এতটুকু দুষ্টুমি করে না।
এই যে লছমিরানী, উঠে পড়লে যে? হয়ে গেলো পড়ালিখা?
নিমকির নাম শুনে দৌড়ে এলি বুঝি? এভাবে কী বলে' বলে' লেখাপড়া হয়?
আমার মতোই, হাঁদাবোকা রয়ে যাবি, বাপ ধরে বেঁধে,
ষোলো না পুরতে তোকে বিহা দিয়ে দিবে। তার চেয়ে দেখ দেখি, দিদিটা কেমন, পড়েলিখে বড়ো হয়ে একাই আপিস যায়, কতো ঘোরে, কতো কিছু জানে!
আচ্ছা, ভাই, চললে বুঝি? কাজ পড়ে আছে? আবার আসবে কিন্তু,
যেকোনো মুশকিল হলে ভাবী বলে ডাক দিও খালি। আমরা তো বহুকাল এখানেই আছি, এইসব জমিটমি আমাদেরই ছিল। এখানে তো সব ঘরই আমাদের চেনে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরাও যাবো, গুছিয়ে বোসো তো। চেনাজানা হবে'খন।
আমার যে ছোটি, পুরাই তোমার মতো, গোরি-চিট্টি সেও।
কাল গৃহপূজা হবে? আচ্ছা বেশ, যাবো। পূজার চৌকি আছে? আর কিছু চাই?
ফলফুল সবই তুমি ভাউয়ের দোকানে পাবে। যা লাগবে বোলো।
আমার দেশের লক্ষ্মী, তাকেও আসবো নিয়ে, ঘরেই আছেন।
Comments