ঈশ্বরপ্রেমিকের সংলাপ

এই যে আমার বন্ধুরা যারা বলেন পার্সোনাল ইজ পলিটিকাল, তারা বছর চারেক আগে অব্দি শুধোতেন, আমি ঈশ্বরবিশ্বাসী কি না, আমার ধর্মবিশ্বাস কী। আছে না নেই। থাকলে কোনদিকে পাল্লা ভারী। এদের সবাইকে আমি একনাগাড়ে বলে গেছি, বা যাই, যে আমি ঘোর নাস্তিক, ঈশ্বরাসিদ্ধ প্রমাণাভাবাৎ, চরম অবিশ্বাসী। কথাগুলো ভুল না। জন্ম থেকে চারপাশে ধর্মের নামে যা দেখছি, মারামারি কাটাকাটি হানাহানি, ৬ মাস থেকে ৯৬ বছর অব্দি  কাউকে ছেড়ে কথা বলে না এই ধর্ম এবং ধার্মিকরা। এই ধরণের ধর্মে এবং এইসব ধর্মের ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে আমার প্রবল অনীহা এবং আপত্তি। জাস্ট বয়ে গেছে। হ্যাঁ, for all intents and purposes, I am an atheist.

বাকি রইল একান্তের কথা, গহন গোপনের কথা। সেইখানে আমার একজন ঈশ্বর আছেন। তিনি নারী না পুরুষ না অলিঙ্গ বহুলিঙ্গ আমি জানি না। দেখতে কেমন তাও ভেবে দেখিনি। ভাবলে বোঝা যাবে, তার আসলে নানা সময়ে নানারকম চেহারা। এই সকালবেলা যদি তিনি তকাই, বিকেলবেলা তবে বিস্কুট, আর মাঝেমাঝে বৃষ্টি পড়লে মুড়িনারকোল। তিনি বকেন না, মারধোর করেন না, শাস্তি দেন না। তিনি অপরাধ করলে ভারী দুঃখ পান। সে দুঃখের কাছে আমাকে এমনিই জানু পেতে বসতে হয়, সরি বলতে হয়, বলতে হয় কেঁদো না, আর করবো না, প্রমিস। সেই ঈশ্বর আমাকে বড়ো ভালোবাসেন, সবসময় কাছেকাছে থাকেন, আমার চারপাশের বাতাসে ওতঃপ্রোত হয়ে মিশে, আমাকে জড়িয়ে বাঁচেন তিনি। তিনি আমার মা, বাবা, তিনি আমার অসম্ভব প্রেমিক, আমার সন্তান, আমার বিল্লিদের গোল্লাচোখ। তার আমার কাছে কোনো দাবিদাওয়া নেই; তাকে পুজো করতে হয় না, রোজরোজ ঘিয়ের প্রদীপ, ধূপ (ধূপের কার্সিনোজেনিক প্রপার্টি নিয়ে সায়ন্তন ভট্টাচার্জির লেখাটা খুঁজে নিয়ে পড়ুন) ধুনো, গাছ থেকে তুলে আনা ফুল পাতা ফল মিষ্টি ইত্যাদি ঘুষ দিতে হয় না। তিনি ওসবের মুখাপেক্ষীও নন, পাত্তাই দেন না। তাকে চেঁচিয়েমেচিয়ে মৃত-সুললিত সংস্কৃত ভাষায় নানারকম বাবা-বাছা করে এই দাও তাই দাও বলতে হয় না, আমাকে পাপ থেকে রক্ষা করো বলেও কান্নাকাটি করে, টাকাপয়সা দানটান করে কোনো লাভ নেই। আর আমি তোমাকেই মানছি, তোমাকে যে মানে না তাকে মেরে ফেলবো এরকম কোনো আশ্চর্য শপথও তিনি আমাকে দিয়ে করিয়ে নেন নি। করলে কি আর তাকে এমন ভালোবাসতাম! আপনারা হয়তো ভাবছেন, এতো আপনি আজ্ঞে করছিই বা কেন, তার মানে পেরেন্ট-চাইল্ড দেনাপাওনা ভয়ভক্তি সম্পর্ক আছেই একটা। আজ্ঞে না, কাঁচকলা। আমি ইচ্ছেমতো তাকে তুমি তুই আপনি যা পারি বলি।

আমার এই ঈশ্বরের সঙ্গে দু'দণ্ড বসে কথা বলা যায়। সে খুব ভালো শ্রোতা, চুপ করে সব বকবক শোনে, আমি যা বলি না, তাও শুনে নেয়। শুনে হাসে। কখনো হাহা করে, কখনো মিটিমিটি। সেই হাসি থেকে আমি ঠিক বুঝতে পারি, আমি যা করছি, যা ভাবছি তার জল কোন দিকে গড়াবে। সবচেয়ে মজা হয় যখন সে আমাকে বলে অপেক্ষা কর, ঠিক দিশা পাবি। আমি হয়তো গালে হাত দিয়ে হাঁ করে বসে থাকি, যেটুকু না করলেই নয় সেটুকুই করি। তারপর হঠাৎ দেখি কোথা থেকে জিগ্স পাজলের টুকরোগুলো বসে যাচ্ছে খাপেখাপে। এই যেমন কাল রাতে সমীর (SAMEER) গেস্টহাউস থেকে বেরোনোর সময় মনে পড়ল ঠিক বারো বছর আগে এই রাস্তা দিয়েই হেঁটে গিয়েছিলাম আরেক প্রচণ্ড ঝড়জলের রাতে, যখন ইন্সটির ভিতরেবাইরে প্রায় কিছুই চিনতামনা, লাইব্রেরি ছাড়া। বারো বছর। একটা যুগ, জীবনের এক মন্বন্তর। সেই ঘুরঘুট্টি রাতে, বিদ্যুতের ঝলকানিতে চোখ ধাঁধানো অন্ধকারে সে আমার পাশে পাশে হেঁটেছিল, আলোয় না পৌঁছানো অব্দি। আমি যে প্রায় অন্ধ, দেখতেই পাইনা! তাই বারো বছর পরে একই পথ দিয়ে আসতে আসতে বুঝতে পারলাম, একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো, মহাকালের রথের চাকা ঘুরল একপাক। এইবারে এখান থেকে ছুটি, এইবার মুক্তি।

যাকগে, যা বলছিলাম। আমি ঠাকুরদেবতা মানি না, একদমই। ঠাকুরদেবতা থাকলেই বড়ো ঝামেলা। আজকে বাবরি মসজিদ কাল বামিয়ান বুদ্ধ পরশু বাংলাদেশে হিন্দুদের মন্দির ভাঙা তরশু বার্মা থেকে অহিংস বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের দ্বারা রোহিঙ্গা মুসলমান বিতাড়ন। দূর মশাই, এ বড়ো জঞ্জাল। তার চেয়ে আমার গোপন ঈশ্বর ভালো তো। পরী, এঞ্জেল, মারমেইড ভালো, ইউনিকর্ন ভালো, ড্রাগন ভালো, পক্ষীরাজ ঘোড়া ভালো, বাচ্ছাদের হাসি ভালো, বৃষ্টি, গান, জলতরঙ্গ, ছবি, বাবুইপাখির বাসা, ছোটবড়ো গাছ, ছোটবড়ো মানুষ ভালো, বইপত্তর ভালো, পিটার প্যান তো খুবই ভালো। এইসব নিয়েই থাকা। দিব্যি থাকা যায় কিন্তু, ট্রায়েড অ্যান্ড টেস্টেড। আরো অনেকে থাকেন, তাদেরও চিনি।

বাকিরা যারা একটা ফেসবুক পোস্ট নিয়ে বেশ কয়েকটা মৃতদেহ সৃষ্টি করে ফেললেন, তারা দু'চারদিন এভাবেও বেঁচে দেখতে পারেন। এক দু'মাইল না হয় হাঁটলেন একবার, ধর্মহীনতার জুতো পায়ে পরে। খুব একটা কষ্ট হবে না, হাজার হাজার বছর ধরে পরে পরে চটিগুলো নরম হয়ে গেছে, তাতে লাগানো আছে সুন্দর সাদা পালকের একজোড়া ডানা, তা আগে ছিল গায়ত্রীর, পরে প্রমিথিয়াসের, তারপর হার্মিসেরও, গ্যাব্রিয়েলেরও।

Comments

Popular Posts