ক্রুইজের গল্প

ক্রুইজ নিয়ে লিখতে গিয়ে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হলাম :(

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি তাহলে। ২০০৫ সালের কথা, ম্যাঙ্গালোর ফিশারিজ ইউনিভার্সিটিতে জেআরএফ ছিলাম, এমটেকের পরেপরেই। একই রকম ছোট ট্রলারে করে সপ্তাহে একদিন চল্লিশ কিলোমিটার আউট যাই, মানে কোস্ট থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে ভাসমান একটা বয়া অব্দি। পার্থক্য হলো যে ওদের নিজেদের নৌকা ছিল, বেশি জিনিসপত্র নিয়ে যেতে হতো না প্রত্যেকবার।

একবার, এপ্রিল মাস, সমুদ্র বেশ অশান্ত। জেটি থেকে বেরোবার সময় সার্ফ জোনে নৌকাটা দশ বারো মিটার করে পিচ করছিল। মানে নৌকায় থাকলে আপনার মনে হবে সোজা দশ মিটার উঠছেন আর ধপ করে নোজডাইভ দিয়ে পড়ে যাচ্ছেন।

সার্ফ জোন থেকে বেরোবার পরেও  choppyness কমলো না। সাধারণতঃ খুব জোরে হাওয়া না দিলে গভীর সমুদ্রের ওপরের জল শান্ত হয়, ছোট ছোট (২ মিটার অব্দি) ঢেউ ওঠে। কিন্তু সেদিন বরুণদেবের মুড অফ। তার সঙ্গে পোসেইদনের ঝগড়া লেগেছে ভারতসাগরের দখল নিয়ে। বেলা এগারোটা নাগাদ বয়াতে পৌঁছনোর কথা, সেদিন দু'ঘন্টা বেশি লাগলো। বয়ায় উঠে সেন্সর রিডিং নোট করে, সব চেকটেক করে, জলের স্যাম্পল তোলা হল।

সেদিন টিমে ছিলাম আমি, যোগী আর শ্রীনিবাস, শ্রীকান্তদা পাইলট, তার হেল্পার অজিত। অজিত বেশ নতুন ছেলে, বমিফমি করে হাল খারাপ। এইসব ক্ষেত্রে জলের ভিতর বড়ো হওয়া গরান-গেঁওয়ার পাকানো শিকড়ের মতো শরীরের শ্রীকান্ত রাধাকৃষ্ণনের মতামতই শেষ কথা হিসেবে মানা হতো। তো সে বলল, ঘন্টা তিন পরে জল শান্ত হবে, তখন ফিরবে। তাতে তেল কম পুড়বে। বয়ার সঙ্গে নৌকা বেঁধে আমরা ওইখানেই অপেক্ষা করতে থাকলাম। তখন সমুদ্র পুরো উত্তাল। তারই মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। ছোট নৌকার ছোট কেবিন, তাতে শ্রীনিবাস আর অজিত বসে। নৌকা এক একবার নোজডাইভ দেয়, শ্রীনি এক একবার চোখ বন্ধ করে ডেকে ওঠে, আম্মা! বিপদে পড়লে জগন্মাতৃকা ছাড়া কেই বা বাঁচাবে! আমি কেবিনের বাইরে কাঠের বেঞ্চে, একটা মোটা দড়ি কোমরে পেঁচিয়ে বসে বসে ভিজছি।

হঠাৎ শুনতে পেলাম, স্টার্নের দিকে, অর্থাৎ নৌকার পিছনের ডেকে, ঘটঘট করে কী একটা আওয়াজ হচ্ছে। খুব ভারী ব্যারেল গোছের জিনিস কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে গড়িয়ে নিয়ে গেলে যেরকম আওয়াজ হবার কথা, ঠিক সেইরকম। এদিকে, ওপাশে তখন কিছুই থাকার কথা না, বেঁধে রাখা দুটো স্টিলের বালতি আর জলের ড্রাম ছাড়া। কেবিনের ভিতর থেকে অজিত বলল নিশ্চয়ই জলভূত উঠে এসেছে। শ্রীকান্তদা বলল জলটা পড়ে গিয়ে সিন্টেক্সের ড্রামটা গড়াচ্ছে, নৌকা আরেকটু পিচ করলেই জলে পড়ে যাবে। একটু ধরে নিয়ে বেঁধে ফেলতে পারবি?

এইসব কাজে, হেঁহেঁ, আমার খুবই সাহস, পুরো অ্যারিয়া স্টার্ক, যদিও একটুও সাঁতার জানিনা। নৌকার গায়ের অসংখ্য খাঁজখোঁজ, দড়ি, পেরেক, হাতল ইত্যাদি ধরে পিছনে চলে গেলাম। গিয়ে তো চক্ষু ছানাবড়া।

কাঠের ডেকের ওপর ড্রামের মতো গড়াচ্ছে পিপে নয়, সাক্ষাৎ যোগেশ আগরওয়ড়কর, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এবং কোলিগ। ঘুমে অচেতন, কেবিনের পিছনের দেয়াল ঘেঁষে শুয়ে বা বসেছিল, নৌকার দুলুনিতে ঘুমিয়ে অজ্ঞান! উত্তাল, উন্মুক্ত সমুদ্রবক্ষে, তুমুল বর্ষণের মধ্যে, উনি কাষ্ঠশয্যায় বিরাজমান (রোলিয়মান বলা উচিত)। নৌকাটা রোল করছে, আর ও এক ধার থেকে অন্য ধার পর্যন্ত গড়িয়ে যাচ্ছে, আর অকাতরে ঘুমুচ্ছে!

একবার ভাবলাম, চোখে মুখে জল ছুঁড়ে ঘুম থেকে তুলি; পরক্ষণেই মনে পড়ল, ধ্যাত্তেরিকা, বৃষ্টিই তো পড়ছে! শেষ পর্যন্ত একটা দড়ি ধরে এগিয়ে গিয়ে চড়থাপ্পড় মেরে তুললাম। চোখ রগড়ে উঠে বসে বলল, পৌঁছে গেছি? নামতে হবে? আচ্ছা খাসা সো রহা থা।

Comments

Popular Posts