অতন্দ্রিলা

এই কবিতাটা আমার তেরো বছর বয়েসে লেখা, অর্থাৎ, ১৯৯০-এ। দীর্ঘ এবং অপরিণত, অবশ্যই, কিন্তু তবু প্রিয়। এর পিছনে একটা গল্প আছে।

একদিন পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে বাবা পেয়ে গেলেন তার ফার্স্ট ইয়ারে বেরনো কলেজ ম্যাগাজিন, তাতে তার একটি কবিতা, নাম সম্ভবত অমৃতের দিনরাত্রি। বিষয়, একটি বেকার যুবকের দুঃখকষ্ট। কবিতাটি পড়ে শোনালেন, বললেন, দ্যাখ, আঠেরো-উনিশ বছর বয়েসে কেমন লিখতাম। আমি বল্লুম, চ্যালেঞ্জ নিবি না (শালাটা বলিনি, মা ছিলেন তো)। ঠিক হলো, আমিও লিখবো, মা নিরপেক্ষ বিচারক হবেন।

এই সেই কবিতা।

পুনশ্চ, মা আমাকেই জয়ী ডিক্লেয়ার করেছিলেন, বানান ভুল না করার জন্য পাঁচ নম্বর গ্রেস দিয়ে।

পুনর্পুনশ্চ, এই কবিতা লেখার সময় আমি জয় গোস্বামীর "মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়" পড়ি নাই।

#অতন্দ্রিলা

তিন নম্বর বাস
হ্যান্ডেল ধরে সাত আট জন
মাথার ওপর ঝুলন্ত আকাশ

তোমার শাড়ি আটকে যাচ্ছে কারো হাতে
কোনো ব্যাগে
কিম্বা
লেপটে যাচ্ছে ঘামে ভেজা কারো শরীরে
কমলা সিনেমাহল থেকে পাতকোতলা,
ঝাড়া পঁয়ত্রিশ মিনিট
তারপর আরো দু'তিন কিলোমিটার
পৌঁছও গার্লস স্কুলে
কখনো কখনো দেরী হয়ে যায়

স্কুল অথবা গোয়াল
সেখান থেকে সরাসরি টিউশনে
দুই ছেলে ভদ্রলোকের, বিপত্নীক
উপযুক্ত পাত্রীর অপেক্ষা
গায়ের রঙ তোমার কালো
এখানেও
দেরী হলো

তারপর
অলকাগ্নি জ্বালানো সন্ধ্যায়
মাতৃদেবো ভব পিতৃদেবো ভব
দু'জন প্রায় অথর্বের জন্য
কিনে নাও দরকার মতো ওষুধ-পথ্য
যথা নিযুক্তোঽস্মি তথা করোমি

আকাশ তোমার শঙ্খচিলের উদাস ডানা
দু'চোখ তোমার কংসাবতীর আগুন চড়া
সকাল বিকেল ছোলামটর -- হরি, হরি
কিম্বা তোমার ইচ্ছে আশার জ্যান্ত মরা

দু'টো বোন আছে আরো
একজন ভালো সেলাইএ,
আরেকজন ইতিহাসে
ইনভিন্সিবল আর্মাডা।

সন্ধ্যা ডুবে যায় চাঁদজ্বলানো রাতে
মালবিকাগ্নিমিত্র, কুমারসম্ভব অথবা রেডিও
অথবা আরব্যরজনী
অথবা

অনঙ্গ সে কবেই ভস্ম অতন্দ্রিলা
লুপ্তরাগের আধেক-উষ্ণ আঁচই ভালো
ট্রয় হেলেনের, মগ্নরাতের আগুন নাচে
কালপুরুষের লুব্ধক জ্বলে আকাশ আলো

জানলার ধারে বিশ্বামিত্র না ঋষ্যশৃঙ্গ?
নিস্তব্ধতা বলে যায়
ছাদ আছে মাথার ওপর, রাত্রে ঘুমোবো
অতঃপর
মনের প্রতিমাগৃহে
মেঘদূতের আতিথ্যস্বীকার

আহারান্তে বোসো বিছানায়
ঘরটা আলাদা, এক জানলা আকাশ
আকাশ ভর্তি নীল, তারা, স্বপ্ন, নীলাভ মৃদুতা
নীবিবন্ধোচ্ছ্বসিত শিথিলং যত্র বিম্বাধরাণাং
ক্ষৌমং রাগাদ্ নিভৃত করেষ্বাক্ষিপৎসু প্রিয়েষু

অবাধ উন্মুক্ত অনৈসর্গিক তোমার চিন্তাধারা
অমৃতের আস্বাদনে পটু তোমার নিস্তব্ধ সর্পিল মন
এসো, এসো,
হে আমার প্রভু
হে আমার অশক্ত আসক্তি
আমার বিগত স্কুলজীবনের ল্যাম্পপোস্ট এসো
তার সাথে এসো দূরে দূরে হাঁটা উত্তীয় সখা
এখন আমার দিনরাতজোড়া অন্ধকারে
নাইটল্যাম্পে সবুজ কাগজ তোমার হৃদয়

রাত্রি নিবিড়, অতন্দ্রিলা
হৃদয় তোমার পায়নি খাবার
পায়নি তোমার সুতোর শাড়ি
ছন্দে চলা অবাধ আলো
শাম্ব পাপী, অথবা সেই চিরপ্রেমিক
অন্ধকারে দৃষ্টি তোমার ঝাপসা জোলো
শুকনো হাওয়া বর্ষাবিধুর আমেজ আনে
ইলেকট্রনিক ঘড়ি বললে রাত বারোটা
কাল সকালে জমবে আবার চায়ের আসর
ফুটন্ত ভাত, ডিমসেদ্ধর শ্রাদ্ধঘটা

এখন যতো বকুলচাঁপা মনের মধ্যে করছ জড়ো
তোমার হৃদয় নিংড়ে নেওয়া ষোলোর অকূল সুগন্ধ সে
অহম ছেড়ে তোমার মুখে বয়ম শোনা বরং ভালো
সর্বত্র প্রিয়মিত্রঞ্চ তেন জীবাম্যনাময়ং

Comments

Popular Posts