সুখ ও শ্বেতপ্রস্তরমালা
১
ডাক্তার, ওই যে বাগানের পাশে বারান্দার সিঁড়িতে বসে আছে টেপজামা পরা, ওকে দেখছেন আপনি। ও এই মাঝরাত অব্দি আমার বৌ ছিল, এখন কে আমি জানিনা।
এই কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ অনেক অনেক উঁচু দিয়ে উড়ে যাওয়া একটা প্লেন থেকে পড়ে যেতে যেতে আমি টের পেলাম আমার পাশে বিছানায় যে দেহটা থাকে যে আমার মাথার বালিশ এবং ঘুমের গরম কখনো কখনো ঘাম সে উঠে সরে চলে গেছে। প্রথমে তো, বুঝতেই পারছেন, ঘরের মধ্যেই খুঁজছিলাম। সিগারেট কই, কোথায় যে যায় প্যাকেটটা।
ও আমাকে একেবারেই চিনতে পারছে না ডাক্তার। আমাকে জিজ্ঞাসা করছে সুজন কোথায়।
২
আচ্ছা, এই যে বসে আছি, মশা কামড়াচ্ছে, মা কি জানতে পারছে? আমি কি বকুনি খাবো খুব? মা, অগ্নিভদা এলে তুমি ওই পিয়াঁজ রঙের শাড়িটা পরো কেন? আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাই, শাড়ির নিচে চিকনের কাজ করা বিশাল ঘেরের তোমার সেই লালরঙের শায়া, তাতে বেগুনিরঙের পাড়ের কুঁচি লাগানো। ওই শাড়িটা পরলেই বাপি চশমা খুলে রাখে টেবিলের ওপর, আনমনা হয়ে যায়, জানো? ওই শাড়িটা একটুও ভালো লাগে না মা, আর শাড়িটা যে কি ভালো কি ভালো, ওটা নিয়ে নেবো কি আমি? এই তো সতেরো হয়ে গেছে আমার, টেপ জামার ওপর দিয়ে রোজ রাতে ওই পিয়াঁজ রঙা শাড়ি পরে আমি ঘুরতে যাই, যেখানে সুজন চুপিচুপি এসে আমার হাত ধরে। সুজনকে জানো তো? ওই যে রোগা ছেলেটা বাপির কাছে ইংরিজি পড়তে আসে ওর বাবা ডানলপের শ্রমিক ছিলেন মা ধূপকাঠি বানান ওর দিদি আছে ওকে কিন্তু অনেক অনেক বড়োলোক হতে হবে জানো আমাকে তো অনেক অনেক অপেক্ষা করতে হবে কেন জানিনা। কিন্তু বাপি বলেছে অগ্নিভদা। আমার অগ্নিভদাকে ভালো লাগে না মা। ভয় করে। ও নার্গিসদিদির জন্য লুকিয়ে কেঁদেছিল জানো কি? আমি দেখেছি ওকে সিগারেটের আগুনে ছবি পোড়াতে আর কাঁদতে। আমার ভারি ভয় করে যখন ও তোমার কোমর জড়িয়ে ধরে বলে বৌদি চা খাবো আর তুমি পিঁয়াজরঙের শাড়ি পরো যার নীচে কুঁচি দেওয়া বেগুনীপাড় লাল শায়া। আমি কেবলই দেখি একটা রুপোলী ফ্রেমের মধ্যে তোমাকে আর তোমার শাড়ির আঁচল বেয়ে পাক খেয়ে উঠতে থাকে আগুন আর ধোঁওয়া আর ধোঁওয়ার অজগর।
৩
শোনো, শুনছো? তুমি ঘরে যাবে না? তোমার কি কষ্ট হচ্ছে?
ঘোরলাগা চোখ তোলে সে। আহা, তার যুবতীশরীরে পাকেপাকে জড়িয়ে উঠেছে এ কী নিদ্রাদোষ, এ কোন গ্রহনক্ষত্রের ফের। বাগানের সিঁড়িতে কাল যেখানে অশ্বত্থের বীজপাতা উপড়ে ফেলে দেবে ঠিকেমালী, সেইখানে হাঁটু মুড়ে সে ভাবে কার যেন আসার, আশার কথা ছিল। সুজন বন্ধুর ঘাটে পাল তুলে নষ্ট আলাপন। শোনো, তুমি কি বিষণ্ণ খুব? ক্লান্ত পায়ে এলোমেলো হাঁটো? আমারও বরষা এলে ধূপধুনো চন্দনের ঘর। পরস্ব মেঘের ভার ঠোঁটে চোখে জিভের আড়ালে। তবু জানো, খুব যদি দেরী হয়ে যায়, বুকের নরম মাংসে বিপর্যস্ত রক্তফুল অবাধ্য বাগান।
তারপরও, তবু, সূর্যোদয়।
৪
অগ্নি, কী হবে!
আচ্ছা, ওই ছেলেটিকে, কী যেন নাম, সুজন, ওকে একবার আসতে বলা যায় না?
আরে, সে তো বিদেশে, বৌ-বাচ্ছা নিয়ে থাকে। সে আসবে কেন! আর ওদের কোনো সম্পর্কও তো ছিল বলে জানি না রে।
আহ্, এখন সেটা জরুরি না। তুমি কি বুঝতে পারছ না? ও আমাদের কাউকে চেনে না। কাউকে না। তোমাকে জিজ্ঞাসা করল চশমা কোথায়। কী একটা শাড়ির কথা বলছে মাঝে মাঝে, বৌদি অব্দি বুঝতে পারছে না। ভয় পাচ্ছে। ডাক্তার বলছে এইভাবে চলতে থাকলে ক্যাটাটনিক হয়ে যেতে পারে। সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না।
কী করব আমরা। কী করতে পারি!
ডাক্তার?
৫
শোনো, একটু এদিকে তাকাও, এই আলোর দিকে তাকাও। বাহ্, খুব ভালো মেয়ে। লক্ষী মেয়ে, আজ ভাত খেয়ে নিয়েছ তো? দুষ্টুমি করোনি? ওষুধগুলো সব খেয়ে নেবে কিন্তু, সিস্টারদিদিকে জ্বালাবে না। কই? মাথা নাড়ো, হ্যাঁ বলো তো দেখি? বাহ্, গুড গার্ল।
কী বলছ? একটু জোরে বলো। তোমার ঠোঁট নড়ছে কিন্তু কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না। আমি কে? আমি কে বলো দেখি? আমি ডাক্তার। তোমার যে একটু অসুখ করেছে, তাই আমি তোমাকে দেখতে আসি রোজ। হ্যাঁ, মাও আসেন তো। ওই যে, ওই সোফায় বসে আছেন, চিনতে পারছো না মাকে? কে? না, আমি সুজন নই। আমি ডাক্তার। নাও, এই ওষুধটা খেয়ে নাও তো, সোনা মেয়ে।
৬
সে আসে না। সে আসে না কিছুতেই। কেবলই বাগান আর গাছ আর পিঁয়াজফুল আঁকা কিছু রুপোলি ফ্রেম পুড়ে যেতে থাকে তার আসার পথে পথে। সমস্ত আকাশ শুধু বেগুনি হয়ে যায় আর কে যেন গুমরিয়ে গুমরিয়ে কাঁদতে থাকে অনাহত আর মণিপুরের মাঝখানের পাঁচ হাজার মাইল জোড়া বরফসমুদ্রে। সেই যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, স্বপ্নই তো? আমার সব টুকরো টুকরো সাদা পাথরে হাড় আর চকমকি ঘষার দাগ। ধীরে, সুধীরে, আমাকে পাক দিয়ে উঠতে থাকে নির্মোহ অজগর। তোমার ধাতব শীতল আমার গর্ভ ছিঁড়েখুঁড়ে রজোমোক্ষণের আমিষ গন্ধমাখা একটা দলা বার করে এনে গিলতে থাকে, হে অহি। এই যে চারপাশে ছড়িয়ে আছে, এ আমার গর্ভজাত সহিংস লাল পলাশ, এর বুকের মধ্যে থেকে তুমি তুলে নাও অলব্ধবসন্তের পৌরাণিক শিশু। আমাকে বৃষ্টির মতো মারো। আমি চলতে থাকি শববাহিকার পিছু পিছু। তার কাঁচের ঘরের ভিতর শোয়ানো আছে আমার সেই উৎফুল্ল পলাশের গাছ। আমার শুধুই কিছু আক্ষরিক ভালোবাসা ছিল। এখন শেষ বরফের বছর আর উড়ে যাওয়া সোয়ালো পাখিদের ডানার নীল তার ঠিকানাহীন এই ভিজে ছিঁড়ে যাওয়া অন্তর্দেশীয় চিঠির কাগজে। সে আসে না। আমি তার কেউ নই।
আমি তার কেউ নই? কাকে তবে কবিতা শোনায়?
৭
জাগো, জাগো বেহুলা। এতো ডাকছি তোমাকে মোমপুতুল। তাকিয়ে দেখো, এই তোমার জন্য আমি এনেছি সুইজারল্যান্ডের টিকিট। তুমি উঠে বসলেই আমরা বেড়াতে চলে যাবো, পাহাড়ের মাথায় একটা সুন্দর শ্যালেতে গিয়ে থাকবো দুজনে। তুমি চাইলেই আমরা সেখান থেকে দেখতে যেতে পারি নীলনদ আর পিরামিড। আমি কি কিছু ভুল করেছি? কিছু কি দোষ করেছি তোমার কাছে? আমার জন্যই কি তুমি এমন ঘুমিয়ে পড়লে অসময়ে? উফ, সিগারেট কই? কতো দিন, কতো রাত তোমাকে জানি না। এই যে স্পর্শ করছি তোমাকে, তোমার এই ঈগলের ডানার মতো জোড়া ভ্রূ, এই চোখের পাতা, তোমার ফ্যাকাসে সাদা গাল। আমিই তো তোমাকে ফুটিয়েছিলাম, আমার শৌখীন, নরম ভায়োলেট ফুল। এইভাবে আঙুল রেখেছিলাম তোমার এই সুন্দর নিটোল উরুর ওপর। তোমার এই শরীর, এই উষ্ণ, নরম শ্বেতপাথরের মতো দেহ, এ তো আমাকে চেনে। এই লম্বা সরু আঙুলগুলো, এই তোমার চুল, এরা কি আমাকে চিনবে না? ওঠো, ওঠো, দেখো, তোমার আগুন এনেছি। দেখো, এই স্পর্শ নাও তোমার পুরন্ত ঠোঁটের ওপর। আমার মুখে এসে লাগছে তোমার কাঁপা কাঁপা শ্বাসের হল্কা। একটু কি জাগছো তুমি? এইভাবে যদি আমার বুড়ো আঙুল আর মধ্যমার মধ্যে ধরে টান দিই তোমার স্তনবৃন্তে, একটু কি কেঁপে উঠছো তুমি? আহ্, এই স্তন, নরম, কঠিন, সাদা, এর মধ্যে ডুবে যাই। শোন্, আমি সেই ব্যান্ডমাস্টার। আমি অংক কষতে পারি ম্যাজিক। আমার দশ আঙুল দিয়ে পিয়ানোর মতো বাজাতে পারি তোকে আমি, আমার মোমের ব্যালেরিনা। উঠবি না, তাকাবি না তুই? এই দ্যাখ, তোর উরুদুটো খুলে ধরে কী করছি আমি। এই যে ছুঁয়ে দিচ্ছি বস্তিদেশ, ঘন রোমের ত্রিবলী। আমার কঠিন আঙুল স্বতস্চল, তীব্র হয়ে নামছে তোর অঙ্কুরে, গভীরে। আহ্, তুই আমার, শুধুই আমার, আমি ডাকলেই তুই আসিস, আয়, আয় বলছি! শুনতে পাচ্ছিস না? সত্যি শুনতে পাচ্ছিস না তুই? এই পাথর আমি ভাঙবো। এই পাথর আমার। শুনছিস? তুই পাথর হলেও আমার, আমার তোকে চাই। চাইই।
৮
যা শোনার ডাক্তারের কাছে শুনেছি।
দেখো, আমার বলার কিছু নেই। কিছুই নেই। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি, আমি!
যা হবার হয়েছে, অগ্নি। আমরা আমাদের মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো।
বৌদি, তুমি অন্ততঃ একটু বোঝো। ওর কোনো ক্ষতি আমি করতে চাইনি। আমি ভেবেছিলাম ওকে জাগাতে পারবো। প্লিজ। প্লিজ।
ও যদি কখনো জাগে, ওকেই বোলো।
অবশ্য তুই অন্য রাস্তা দেখতে পারিস। সেপারেশনই ঠিক বলে মনে হয়। তোর জীবনটাও তো!
উহ্!
৯
কী সুন্দর একটা ফ্রক পরেছ তুমি আজকে! দিদি পরিয়ে দিয়েছে? বাহ্, খুব সুন্দর তো! বাবা এনে দিয়েছেন বুঝি? একদম সিন্ডারেলা জামা। তোমার নাম কী? সিন্ডারেলা? না রাপুনজেল? কই, একটু এদিকে তাকাও তো। এই যে, লিটল মারমেইড, জলপরী, হ্যাঁ, এই যে আমার আঙুলের দিকে তাকাও। বাহ্, ভেরি গুড। গুড গার্ল।
আচ্ছা শুনুন, ওষুধ পালটে দিচ্ছি আজ থেকে। লোরাজেপাম ইঞ্জেকশনটা আর চলবে না আপাততঃ। তিন মাস হলো তো। আপনারা তো ইসিটিতে রাজি নন। তাহলে এইগুলোই চলুক।
আরে হ্যাঁ, এখুনি চিন্তার কিছু নেই, ও স্টেবল আছে। আমি তো আসছিই। কেসটা নিয়ে কথাও চলছে। মানে অনসেটের কারণটা!
অ্যাঁ? কী বলছো? এই যে, মিষ্টি মেয়েটা, কী বলছো তুমি? একটু জোরে বলো? হ্যাঁ, বলো? কী? কে? সুজন? হ্যাঁ, আমার নাম সুজন। হ্যাঁ তো। গুড গার্ল, ভেরি গুড গার্ল।
আমার যেন মনে হয় ওর ঠোঁট কাঁপে। আস্তে, খুব আস্তে, ঠোঁট নড়তে থাকে ওর। গলায় একরাশ কুঁচি দেওয়া স্ট্রবেরি আঁকা সাদা ঢোলা ফ্রক পরে বিছানায় শুয়ে থাকে ও। মাঝেমাঝে চোখের তারায় কাঁপন জাগে। মাঝেমাঝে, হঠাৎ করে, আমার মনে হয় ও কিছু জিজ্ঞাসা করছে। আমি কেবলই উত্তর দেবার চেষ্টা করতে থাকি, প্রাণপণে।
১০
এইভাবেই, ধীরে, সুধীরে নির্মিত হয় শ্বেতপাথরের অমোঘ সোপান। সে আলতো পায়ে উঠে এসে দাঁড়ায় অতি সূক্ষ্ম নীলাভসবুজ প্রস্তরজালিকা-মণ্ডিত শুভ্র শীতল পাদপীঠে। তার পায়ের পাতা ক্রমশঃ নরম, মসৃণ, ঠাণ্ডা হতে হতে পাথর হয়ে যায়। অতি ধীরে, আণবিক পদসঞ্চারে, ক্রমশঃ নির্মোহ, ভঙ্গুর ও কেলাসিত হতে থাকে তার কোষসমূহ। চুনাপাথরের যে বীজ সে তার শরীরে জায়কালে ধারণ করেছিল, অতি ধীরে ফুল্লকুসুমিত হয় তারা, রূপান্তর ঘটে যায় অগোচরে, মর্মের গহন গভীরে। ধীরে, সুধীরে, তাকে জড়িয়ে জড়িয়ে ওঠে আদিম কঠিন চিরতুষারের মতো নীলাভসবুজ মহাসর্প। তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে শিকড়-বাকড়ে ঘিরে দাঁতে-নখে আঁকড়িয়ে ধরে এক মহাকায় শীতার্ত পলাশ। তার চেতনার সমস্ত অবয়ব জুড়ে ভেসে থাকে কেবলই এক প্রায়ান্ধকার পিঁয়াজরঙা আকাশ যার বুকজোড়া লাল উল্কার ছেঁড়াখোঁড়া আলোয় আঁকা হয় অগণিত স্বস্তিবাচন, অনন্ত তাবিজ। সে ক্রমশঃ দূরে সরে যেতে থাকে। সে ঘুমিয়ে পড়তে থাকে। শুধু মাঝেমধ্যে, অনন্তবিস্তৃত একটা টানেলের যেন অপর প্রান্ত থেকে তার নিঃস্তব্ধতাকে ছুঁয়ে যায় একটা অন্ধ একগুঁয়ে অনুরণন। সেই ডাকে সাড়া দিতে তার বুক ফেটে যায়।
একটা নুন-মরিচ মাথা তবু মাঝেমধ্যে কান পাতে তার দুটি ক্রমশঃ স্পন্দনহীন ওষ্ঠের শ্বাসাঘাতের মাঝখানে। দুটি প্রৌঢ় চোখ স্থির তাকিয়ে থাকে ওই শান্ত দৃশ্যের দিকে। খুব অল্প, অত্যল্প, তিলপরিমাণ কাঁপলো কি তার ঠোঁটদুটি? সে কি বলল, সুজন? হ্যাঁ, আমি সুজন, আমিই সুজন। কে যে কখন কার জন্য সুজন হয়ে যায়, কে বলতে পেরেছে! ওঠো, আমার বিষাদপ্রতিমা। ওঠো, জাগো, ফিরে এসো তোমার সুজনের জন্য, তোমার সুজনের কাছে, ফিরে এসো, গ্যালাতিয়া।
Comments